ভিডিও গ্যালারি
সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭
  •   মুজাহিদ, সাকা চৌধুরীর রিভিউ আবেদন খারিজ: মৃত্যুদন্ড বহাল
  •   জর্ডানে দুই জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
পাচার হওয়া টাকা ফেরতও আসছে?
প্রথম আলোতে লিখেছেন আসজাদুল কিবরিয়া
Publish Date : 2017-04-21,  Publish Time : 06:53,  View Count: 210    8 months ago

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে টাকা পাচার হওয়ার বিষয়টি এখন আর কোনো অজানা বা বিস্ময়কর তথ্য নয়। বছরে গড়ে অন্তত ৫৫০ কোটি ডলার পাচার হওয়ার হিসাব মিলছে। এটি পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল উপাত্ত না হলেও টাকা পাচারের প্রবণতা বোঝাতে যথেষ্ট। আর টাকা পাচার কীভাবে হচ্ছে, সে সম্পর্কে যা জানা যায় তা টাকা পাচার হওয়ার বিষয়টি জোরালোভাবে সমর্থন করে।
তবে ইদানীং জানা যাচ্ছে, পাচার হওয়া টাকা অল্প পরিমাণে হলেও দেশে ফিরে আসছে। অর্থনীতির অন্তত একটি সূচক
থেকে বিষয়টি স্পষ্ট। আর তা হলো বিদেশি বিনিয়োগের পরিসংখ্যান। সম্প্রতি বছরগুলোয় বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আগমনের পরিসংখ্যান নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করলে এ বিষয়টি ধরা পড়ে।
দেখা যাচ্ছে যে এমন কিছু দেশ ও ভূখণ্ড থেকে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে, যেখান থেকে এই বিনিয়োগ আসার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। যেমন পানামা, মরিশাস, সেশেলস, কেম্যান আইল্যান্ডস, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস ইত্যাদি। বাংলাদেশ ব্যাংকে বিদেশি বিনিয়োগের উৎসের যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায়, তা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে ট্যাক্স হ্যাভেন বা করের নিরাপদাবাস (হেভেন বা স্বর্গ নয়) হিসেবে পরিচিতি দেশ ও ভূখণ্ড থেকে বিদেশি বিনিয়োগের অন্তত ১৫ শতাংশ আসছে।
ট্যাক্স হ্যাভেন বলতে আসলে সেই সব দেশ ও ভূখণ্ডকে বোঝায়, যেখানে যেকোনো পরিমাণ অর্থ নিরাপদে ও গোপনে গচ্ছিত রাখা যায়, অর্থের উৎস নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা হয় না এবং কোনো রকম কর দিতে হয় না বললেই চলে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে কথিত এসব করের নিরাপদাবাসে সাধারণত সেই সব অর্থই আসে, যেসব অর্থ কর ফাঁকি দিয়ে অর্জিত কিংবা কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য বাইরে পাচার করা হয়। অন্যভাবে বললে, বিভিন্ন দেশের কালোটাকার মালিকেরা তাঁদের অর্থ-সম্পদ নিরাপদে গচ্ছিত রাখতে এসব দেশ বা ভূখণ্ড বেছে নেন। অবশ্য অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ-সম্পদের পাশাপাশি বৈধভাবে অর্জিত কিছু অর্থও পাচার হয়।
সুইজারল্যান্ড ও লুক্সেমবার্গের মতো উন্নত দেশ নিরাপদে বিনা প্রশ্নে যেকোনো পরিমাণ কালোটাকা গচ্ছিত রাখার সুযোগ করে দিয়ে আসছে যুগের পর যুগ ধরে। তবে গত কয়েক বছর সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থের মালিকদের তথ্য প্রদানের জন্য খোদ যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক উন্নত দেশ ও ভারত চাপ তৈরি করেছে। ফলে, সুইস ব্যাংকগুলোয় অর্থ রাখা অনেকেই নিরাপদ বোধ করছেন না। আর তাই পাচার হওয়া টাকার বিকল্প গন্তব্য হয়ে উঠছে সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। অন্যদিকে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস বা কেম্যান আইল্যান্ডের মতো দ্বীপগুলোও (এগুলো সার্বভৌম রাষ্ট্র নয়, ব্রিটেন বা আমেরিকার অধীনে একধরনের স্বশাসিত ভূখণ্ড) বহু বছর ধরে পাচারকৃত অর্থ-সম্পদ নিরাপদে গচ্ছিত রাখার বিভিন্ন ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। অর্থ-সম্পদের মালিকের গোপনীয়তা এখানে সর্বাগ্রে। এগুলো অফশোর জুরিসডিকশন নামেও পরিচিত।
এখন প্রশ্ন হলো, পাচারকৃত অর্থ এই নিরাপদ স্থান থেকে আবার অন্যত্র যায় কেন? আসলে যাঁরা এসব দেশ বা ভূখণ্ডে অর্থ নিজ দেশ থেকে সরিয়ে আনেন, তাঁরা তো এগুলো অলস ফেলে রাখার জন্য আনেন না। এসব স্থানে টাকাগুলো তাঁরা ভুয়া কিছু কোম্পানির নামে গচ্ছিত রাখেন। মানে, এসব কোম্পানি খোলাই হয় পাচারকৃত অর্থের বৈধতা দিতে। তারপর এই কোম্পানি বিদেশি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিনিয়োগ করতে যায় সেই দেশেই, যে দেশ থেকে টাকা পাচার হয়েছে। এখানে বিদেশি বিনিয়োগকারী হিসেবে মেলে নানা ধরনের প্রণোদনা ও কর ছাড়। আবার দ্বৈত কর পরিহারব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে এসব কোম্পানি তথা অর্থের মালিকেরা কর প্রদান থেকে বিরত থাকতেও পারেন। যেমন ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে নিবন্ধিত একটি টেক্সটাইল কোম্পানি বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধন নেয়। এরপর এ দেশে বিনিয়োগ করে বা টাকা খাটায়। ব্যবসার যে মুনাফা হয়, তা বিদেশি বিনিয়োগকারী হিসেবে উত্স দেশে প্রত্যর্পণ করে বা পাঠিয়ে দেয়। উত্স দেশে (ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে) কোনো কর না থাকায় পুরো মুনাফাটাই থেকে যায়। আবার বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারী হিসেবে শতভাগ মুনাফা প্রত্যর্পণসুবিধা মেলে।
ভারতে বিদেশি বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান উৎস হলো মরিশাস। ২০১৬ সালে ভারতের ২০ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে এই ছোট দ্বীপদেশ থেকে। আর এটা এখন সর্বজনজ্ঞাত যে ভারতীয়রা নিজ দেশের পাচারকৃত অর্থ আবার মরিশাস থেকেই ভারতে বিনিয়োগ করছেন করের সুবিধা নেওয়ার জন্য। এভাবে একটি দেশের অর্থ পাচার হয়ে আরেকটি দেশ ঘুরে সে দেশের পুঁজি হিসেবে মূল উৎস দেশে বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে ফিরে আসাকে বলা হয় রাউন্ড ট্রিপিং। এ বিষয়ে রাশ টানতে ভারত সরকার অবশ্য গত বছর মরিশাসের সঙ্গে দ্বৈত করারোপ পরিহার চুক্তিতে সংশোধন করেছে। ফলে, ২০১৯ সাল থেকে মরিশাস থেকে ভারতে স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগে (মূলত পুঁজিবাজারে) ১৫ শতাংশ হারে মূলধনি মুনাফা কর প্রযোজ্য হবে।
তবে সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত করের নিরাপদাবাস কি না, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। এই দুটি দেশ কোনোভাবেই এই অভিধা মেনে নিতে রাজি নয়, যদিও তারা অন্য সব ট্যাক্স হ্যাভেনের মতোই যাবতীয় কর ছাড়, বিনিয়োগের সুবিধা ও গোপনীয়তা দিচ্ছে। জি-২০ জোট গত বছর প্রকাশ্যে এই বলে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে হুমকি দিয়েছে যে যদি দেশটি কর ও বিনিয়োগের তথ্য বিনিময়ের বিষয়ে চুক্তি করতে সম্মত না হয়, তাহলে তাদের ট্যাক্স হ্যাভেন হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত করা হবে।
সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশে মোট ১৫টি করের নিরাপদাবাস থেকে গত ছয় বছরে (২০১১-২০১৬) মোট ২৬ কোটি ডলারের নিট বা প্রকৃত বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। এটি এই সময়কালে দেশে আগত সমন্বিত প্রকৃত বিদেশি বিনিয়োগের প্রায় ১৪ শতাংশ। অবশ্য সিঙ্গাপুর ও আরব আমিরাত থেকে যে পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে, তার পুরোটাই যে পাচার হওয়া অর্থ, এমনটি বলা হয়তো কঠিন, যদিও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি রয়েছে বাংলাদেশের। তাই এ দুটি দেশের বিদেশি বিনিয়োগ বাদ দিলে বাকি ১৩টি করের নিরাপদাবাস (বারমুডা, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, কেম্যান আইল্যান্ডস, সাইপ্রাস, লুক্সেমবার্গ, ম্যাকাও, মাল্টা, মরিশাস, সেশেলস, পানামা, সুইজারল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ) থেকে আগত মোট বিদেশি বিনিয়োগের অনুপাত দাঁড়ায় প্রায় ৫ শতাংশ। এর মধ্যে সিংহভাগই এসেছে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস থেকে। আর এটি যে আসলে রাউন্ড ট্রিপিং তা মোটামুটি নিশ্চিত। অন্য কোনো দেশের বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চাইলে এসব করের নিরাপদাবাসে গিয়ে কোম্পানি খুলে তা করবেন না। কেননা, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগকারী হিসেবে এমনিতেই বাংলাদেশে তাঁরা কর ছাড়সহ নানা সুবিধা পাবেন।
এখন এই ধরনের বিদেশি বিনিয়োগ কি নজরদারির মধ্যে আনতে হবে? জানতে চাইতে হবে এসব অর্থের উৎস? কিছুদিন আগে রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় দেশের একাধিক ব্যবসায়ী নেতা এই প্রসঙ্গে আলোকপাত করতে গিয়ে করের নিরাপদাবাস থেকে আগত বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা যুক্তি দেখিয়েছেন, এমনিতেই বিদেশি বিনিয়োগ অনেক কম, বছরে মাত্র ২০০ কোটি ডলার। এই বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য যখন নানামুখী চেষ্টা চলছে, তখন ট্যাক্স হ্যাভেন থেকে সামান্য কিছু বিনিয়োগের উৎস নিয়ে প্রশ্ন করা ঠিক হবে না। তাঁদের আহ্বানে যৌক্তিকতা আছে। তা ছাড়া বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের উৎস নিয়ে সাধারণত প্রশ্ন করা হয় না। এই নীতি সব বিদেশি বিনিয়োগের জন্যই সমভাবে প্রযোজ্য। পাচার হওয়া কিছু টাকা যদি সত্যিই বিদেশি বিনিয়োগ আকারে ফিরে আসে, তাহলে তাকে স্বাগত জানাতে দ্বিধা থাকা উচিত নয়। বরং দেশ থেকে টাকা পাচার নিয়ন্ত্রণে অর্থবহ কিছু করা যায় কি না, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে।
আসজাদুল কিবরিয়া: লেখক ও সাংবাদিক।
asjadulk@gmail.com









ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com