ভিডিও গ্যালারি
সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭
  •   মুজাহিদ, সাকা চৌধুরীর রিভিউ আবেদন খারিজ: মৃত্যুদন্ড বহাল
  •   জর্ডানে দুই জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
মেরাজ :মানবেতিহাসের অবিস্মরণীয় রেকর্ড
নয়াদিগন্তে লিখেছেন ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন
Publish Date : 2017-04-21,  Publish Time : 06:53,  View Count: 163    8 months ago

মানবেতিহাসের সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ হলেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহানত্ব নিয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বের কারও মধ্যে কোনো দ্বিধাবিভক্তি নেই। প্রখ্যাত পাশ্চাত্য দার্শনিক ও ঐতিহাসিক মাইকেল এইচ হার্ট রচিত 'দ্য হান্ড্রেড' গ্রন্থে পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ প্রভাবশালী শত মনীষীর যে বৃত্তান্ত পরিবেশিত হয়েছে, তাতে যাকে ১ নম্বরে স্থান দেওয়া হয়েছে, তিনি হলেন বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)। গ্রন্থটির ভূমিকায় লেখক উল্লেখ করেছেন- বিশ্ব সভ্যতায় প্রভাব বিস্তারকারী মনীষীবৃন্দের মধ্যে অনেকেই নিজের দেশের কথা, নিজস্ব সমাজের কথা, নিজের ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির কথা, নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্যে কথা বলেছেন। অর্থাৎ মানবেতিহাসের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ অনেকেই সীমিত গণ্ডীর মাঝে থেকেও স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্যাবলি তুলে ধরে বিশ্ব সভ্যতায় অনন্য অবদান রেখেছেন। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে হজরত মুহাম্মদ (সা.) একমাত্র মনীষী, যিনি একই সঙ্গে বিশ্ববাসীর কথা বলেছেন। সাধারণ মানুষের কথা, শ্রমিকের অধিকারের কথা, নারীর সম্মান ও মর্যাদার কথা, শিশু অধিকার, যুবকের প্রাপ্যতা, বৃৃদ্ধের অবস্থান, বাবা-মায়ের অধিকার, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের মানবিক ন্যায্যতাসহ একসঙ্গে সব বিষয় নিয়ে যিনি কথা বলেছেন, বাস্তবে সেগুলোর রূপায়ণে প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালিয়েছেন এবং সর্বতোভাবে যিনি সাফল্যের মুখ দেখেছেন, তিনি হলেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তার জীবন বিস্ময়ের জীবন, তার কর্ম অসাধারণ, তার আদর্শ নজিরবিহীন এবং তার ব্যক্তিত্ব অপরিসীম। মানবেতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষকে রেকর্ডের দিক থেকেও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হয়। আর বিশ্বনবীর জীবনে বিশ্বসভার সেই সর্বশ্রেষ্ঠ রেকর্ডটি হলো মেরাজের অবিস্মরণীয় ঘটনা।

মেরাজের ঘটনাটি আক্ষরিক অর্থেই বিস্ময়কর। এটি অভূতপূর্ব এবং পৃথিবীর অন্য যে কারও জন্য তা ঘটানো অসম্ভব। পৃথিবীর ইতিহাসে এর চেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা, এর চেয়ে বড় আর কোনো রেকর্ড হতে পারে না। এটি সর্বশ্রেষ্ঠ মানবের জন্য সর্ববৃহৎ রেকর্ড। মেরাজের ঘটনাটি যে কতটা বিস্ময়কর, তা মহান আল্লাহর বক্তব্যেই পরিষ্কার হয়েছে। আল্লাহপাক বলেন- সুবহানাল্লাজি আসরা বিআবদিহি লাইলাম মিনাল মাসজিদিল হারামি ইলাল মাসজিদিল আকসাল্লাজি বারাকনা হাউলাহু লিনুরিয়াহু মিন আয়াতিনা....। এখানে স্মর্তব্য, আমরা কোনো আজব বা বিস্ময়কর ঘটনা প্রত্যক্ষ করলে বা শুনলে নিজেদের অজান্তে 'সুবহানাল্লাহ' বলে উঠি। এখানে লক্ষণীয়, মহান আল্লাহ মেরাজের মতো অলৌকিক ও অনন্যসাধারণ এ ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে কোরআন কারিমে তিনি নিজেই 'সুবহান' শব্দ দিয়ে শুরু করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এর মধ্য দিয়েই মেরাজের গভীর তাৎপর্য উপলব্ধি করা যায়।

রাসূল (সা.) মেরাজের রাতে উম্মে হানির ঘরে শায়িত ছিলেন। অলৌকিকভাবে সেখানে ফেরেশতাদের সর্দার জিবরাইল (আ.) এসে আবির্ভূত হন এবং মেরাজের সুসংবাদ প্রদান করেন। মানবেতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ঘটনার জন্য শারীরিক ও মানসিক যে প্রস্তুতি প্রয়োজন, তা পুরো মাত্রায় নেওয়ার জন্য রাসূলের (সা.) জীবনের আরেক অলৌকিক ঘটনা 'বক্ষ বিদীর্ণকরণ' সম্পন্ন হয় এবং তার পর অত্যন্ত দ্রুতগামী বাহন 'বোরাক', যা কি-না বিদ্যুৎ গতিতে বা তার চেয়েও অধিক বেগে ধাবিত হয়, তাতে আরোহণ করেন। এখানে ঘটনার শুরুতেই বক্ষ বিদীর্ণ করা এবং বোরাকের অবতরণও মেরাজের গুরুত্ব ও এর সত্যতার প্রমাণ বহন করে।

রাসূল (সা.) বোরাকে চড়ে মুসলমানদের প্রথম কিবলা বায়তুল মোকাদ্দাসে গমন করেন। সেখানে আরেক বিস্ময়কর ঘটনার সংযোজন হয়। সৃষ্টির প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে পৃথিবীতে নানা যুগে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত নবী-রাসূলগণ সেখানে সমবেত হয়েছেন সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল মুহাম্মদের (সা.) ইমামতিতে নামাজ আদায়ের জন্য। তারা শ্রেষ্ঠ মানবের প্রতীক্ষায় ছিলেন। এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। রাসূল (সা.) মসজিদে আকসায় প্রবিষ্ট হলেন এবং সব নবী-রাসূলের সামনে ইমামতি করলেন। এটিও সেই সর্বশ্রেষ্ঠ রেকর্ড মেরাজকে আরও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করায়। নামাজ আদায় শেষে অলৌকিক বাহনে করে মহাশূন্যের মেঘের স্তর, বরফের স্তর আর উষ্ণতার সব স্তর ভেদ করে প্রথম আকাশের দরজায় কড়া নাড়লেন; যেখানে সৃষ্টিকুলের শ্রেষ্ঠ মানবকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন হজরত আদম (আ.)। এর পর দ্বিতীয় আকাশে হজরত ঈসা (আ.), তৃতীয় আকাশে হজরত ইয়াহিয়া (আ.), চতুর্থ আকাশে হজরত ইদ্রিস (আ.), পঞ্চম আকাশে হজরত হারুন (আ.), ষষ্ঠ আকাশে হজরত মুসা (আ.) এবং সপ্তম আকাশে হজরত ইবরাহিমের (আ.) সঙ্গে তার দেখা হয়। মানবেতিহাসে আর কোনো মানুষের জীবনে এত বড় সৌভাগ্যের বিষয় আসেনি। সপ্তম আকাশের ওপরে বোরাক নামীয় বাহনের যাওয়ার ক্ষমতা নেই। তাই সেখানে আরেকটি ভিন্ন বাহন 'রফরফ' নামে উপস্থিত হয় এবং রাসূল (সা.) তাতে আরোহণ করে আরও ঊর্ধ্ব জগতের পানে ছুটে চলেছেন।

অনেকের প্রশ্ন_ মানবদেহ নিয়ে সমস্যাসংকুল মহাশূন্য ও এর পথে পথে যেসব স্তর বা বাধা-বিপত্তি রয়েছে, সেগুলো কীভাবে অতিক্রম করা গেল? জবাব হলো, সমুদ্রের গভীর তলদেশ থেকেও মহান আল্লাহ তার স্বীয় কুদরতে মানুষকে রক্ষা করেছেন এবং জ্বলন্ত অগি্নকুণ্ডেও মানুষকে পোড়ানো যায়নি শুধু আল্লাহর ইচ্ছার কারণে। আর এটি যদি আল্লাহ হজরত ইউনুস (আ.) বা হজরত ইবরাহিমের (আ.) জন্য করতে পারেন, তবে তার প্রিয় হাবিব মুহাম্মদের (সা.) জন্য কেন করবেন না বা কেন তেমন ব্যবস্থা করতে সক্ষম হবেন না? বস্তুত মেরাজের ঘটনাটি এমনই, যেটি শুধু বিশ্বাসের বিষয়; কোনো ধরনের যুক্তি দিয়ে এটিকে বিশ্বাস করানো প্রায় অসম্ভব। আর তা বুঝতে পারি আরবের অবিশ্বাসীদের এ সংক্রান্ত অবিশ্বাস দেখে। প্রকারান্তরে শুধু মেরাজের ঘটনা শুনে সঙ্গে সঙ্গে এতে বিশ্বাস স্থাপন করে রাসূলের পরম সাথি হজরত আবু বকর (রা.) 'সিদ্দিক' উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন; যার পুরস্কারস্বরূপ রাসূল (সা.) তাকে বলেছিলেন- আন্তা আবাবাকরিন, আন্তা সিদ্দিক ওয়া আন্তা আতিকুল্লাহি মিনান্নার। অর্থাৎ তুমি আবু বকর! তুমি সিদ্দিক এবং তুমি নিঃসন্দেহে আল্লাহর জাহান্নাম থেকে চিরতরে মুক্ত।

মেরাজের স্থান ও দূরত্ব নিয়ে কেউ কেউ সন্দেহ পোষণ করেন। আরবের লোকেরাও সেই সন্দেহ করেছিল। বস্তুত মহাজাগতিক সেই পরিভ্রমণে যে বিশাল দূরত্ব ছিল, তা অতিক্রম করতে ২৭ বছর লেগেছিল। মহানবীর (সা.) আয়ুষ্কাল বলা যায় ৯০ বছর; কিন্তু ৬৩ বছর বয়সেই তিনি ইন্তেকাল করেন; আর ২৭ বছর হচ্ছে সেই অবিস্মরণীয় ঘটনার সময়কাল। এটিও সেই রেকর্ডের অন্তর্ভুক্ত। অথচ দীর্ঘ সফরের পর প্রত্যাবর্তনে দেখা গেল ওজুর পানি যথারীতি গড়াচ্ছে, বিছানার উষ্ণতা একই রকম আছে। এটির জবাব হলো, সময়ের চাকাটিকে ২৭ বছরের জন্য আটকে দেওয়া হয়েছিল। সবকিছু মহান আল্লাহর ইচ্ছায় স্থগিত করা হয়েছিল। মহাসফরের পরিসমাপ্তিতে সবকিছু আগের মতো আবারও চালু করে দেওয়া হয়।

মহানবী (সা.) মেরাজের প্রারম্ভিক সফরে খোদার আরশে একেবারে পরম প্রভুর অতি সনি্নকটে চলে যান। কোরআনে কারিমের ভাষায়, তা দুই ধনুকের মাথা এক জায়গায় করলে যেমন পরস্পর কাছাকাছি হয়, তারা এর চেয়েও ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলেন। অর্জনের মধ্যে নামাজ, যা প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত, পরবর্তীকালে কমিয়ে তা ৫ ওয়াক্তে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু ঘোষণা করে দেওয়া হয়- ৫ ওয়াক্ত নিয়মিত নামাজ আদায় করলে করুণাময় প্রভু সেই ৫০ ওয়াক্তেরই সমান সওয়াব দেবেন। রাসূল (সা.) সেখানে আরও অনেক বিচিত্র দৃশ্য অবলোকন করে নিজের অভিজ্ঞতার জগৎকে সমৃদ্ধ করে নিলেন এবং একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে সেখান থেকে ফিরে এলেন। বস্তুত জীবন, জগৎ ও বাস্তবতার অপরিহার্য গুণাবলি, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা সঞ্চারের নিমিত্তেই ছিল তার এই ঊর্ধ্ব জগতের পরিভ্রমণ, যা কি-না পরবর্তী জীবনে হিজরত এবং মদিনা রাষ্ট্র গঠন ও জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সহাবস্থানের ক্ষেত্র তৈরিতে অনবদ্য অবদান রাখে।

রাসূলের (সা.) প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজাতুল কুবরাকে হারিয়ে তিনি মানসিকভাবে যে কষ্ট ভোগ করছিলেন, মেরাজের ঘটনার মাধ্যমে তিনি জীবনের শ্রেষ্ঠতম ও সর্বোত্তম সান্ত্বনাও লাভ করেন। তারই সঙ্গে একজন মানুষ হিসেবে, নবী-রাসূল হিসেবে তার জীবনে মোজেজা বা যে অলৌকিকত্ব থাকতে হবে এবং তা যে কোনো মানুষের চাইতে অধিকতর দৃষ্টান্তপূর্ণ এবং তুলনাহীন হতে হবে- মেরাজের অবিস্মরণীয় ঘটনায় সেটির আবেদনও পূর্ণতা পেল। তাই রাসূলের (সা.) জীবনে মেরাজের ঘটনা যেমন অসাধারণ, তাৎপর্যমণ্ডিত ও শিক্ষামূলক, তেমনি মানবেতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ রেকর্ডও হচ্ছে তার এই ঊর্ধ্বজগৎ পরিভ্রমণের অনন্য গাথাটি; যেমনটি আমরা আর কোনোকালেই দেখিনি। মেরাজের মাধ্যমে প্রাপ্ত নামাজকে আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে নিষ্ঠার সঙ্গে ধারণ করে ইহকালীন শান্তি, স্বস্তি অর্জনের পাশাপাশি পারলৌকিক মুক্তি ও সাফল্যের পথ যেন প্রশস্ত করতে পারি_ মহান আল্লাহ আমাদের সে তাওফিক দান করুন (আমিন)।

লেখক ও গবেষক; অধ্যাপক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়










ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com