ভিডিও গ্যালারি
বুধবার, ২৮ জুন, ২০১৭
  •   মুজাহিদ, সাকা চৌধুরীর রিভিউ আবেদন খারিজ: মৃত্যুদন্ড বহাল
  •   জর্ডানে দুই জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
এই তবে শিখছে ওরা!
যুগান্তরে লিখেছেন বিমল সরকার
Publish Date : 2017-04-21,  Publish Time : 06:53,  View Count: 174    2 months ago

একটি কথা আগেই বলে রাখা ভালো, আমি আজ যে বিষয়টির অবতারণা করতে চাচ্ছি- শিক্ষার সঙ্গে, বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্টতা ছাড়া অন্য কারও পক্ষে তা বিশ্বাস করা সহজ বা সম্ভব না-ও হতে পারে। ২০১৭ সালের এইচএসসি পরীক্ষা চলমান। এখন আর কোনো পরীক্ষার্থীরই নিজ প্রতিষ্ঠানে বসে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ নেই। অন্য প্রতিষ্ঠানে বসে পরীক্ষা দিতে হয়। এছাড়া শিক্ষকদেরও নিজ প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে অন্য বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাসংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আমাদের দেশে এ নিয়ম চলে আসছে।
দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার, ৬ এপ্রিল, ২০১৭। ইংরেজি প্রথমপত্রের পরীক্ষার দিন। একটি কক্ষে পরিদর্শক হিসেবে আমরা দু’জন দায়িত্ব পালন করি। কক্ষটিতে মোট ৪০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২০ জনের ওএমআর শিটে (উত্তরপত্রের উপরের অংশ) আমি স্বাক্ষর করি। সরবরাহকৃত উত্তরপত্রের কভার পৃষ্ঠার এক স্থানে লেখা আছে ‘পরীক্ষার দিন’। এখানে পরীক্ষার্থীরা সপ্তাহের যে ‘বার’ বা দিনটিতে পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হয় তা লিখে থাকে। লক্ষ্য করলাম, বৃহস্পতিবার বানানটি অনেকেই শুদ্ধ করে লিখতে পারেনি। কৌতূহলী হয়ে কৌশলে একে একে বাকি ২০ জনের উত্তরপত্রও দেখলাম। কিন্তু না। অবস্থার তেমন কোনো হেরফের নেই। ৪০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২১ জনই, আমি আবারও উল্লেখ করছি, কক্ষটির মোট ৪০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২১ জনই বৃহস্পতিবার বানানটি শুদ্ধ করে লিখতে পারেনি। প্রত্যেকের জীবনের প্রথম পাঠের সময়ই যা ভালো করে শেখার কথা- সাত বারের নাম, বারো মাসের নাম ইত্যাদি, তা কারও আঠারো বা উনিশ বছরেও রপ্ত না হওয়ার বিষয়টি অবিশ্বাসেরই কথা। কিন্তু আমি খুবই দুঃখিত যে, নিজের চোখ ও বোধশক্তিকে কোনোভাবেই ফাঁকি দিতে পারিনি। কেউ লিখেছে ‘বৃহষ্পতিবার’, আবার কেউ কেউ লিখেছে ‘বৃহস্প্রতিবার’। ‘বৃহঃবার’, ‘বৃহসপতি বার’, ‘বৃহষ্প্রতিবার’- এভাবেও লিখেছে কেউ কেউ। একাদিক্রমে পাঁচ-ছয় বছরের প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পাঁচ বছরের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা ছাড়াও কলেজে দুই বছরের উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের নিয়মিত কোর্স সম্পন্ন করার পর শিক্ষার্থীদের যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে সঙ্গত কারণেই এ নিয়ে সবার মনে কিছু প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে। সাতটি বারের মধ্যে একটি হচ্ছে বৃহস্পতিবার। শিক্ষার্থীরা শৈশব ও বাল্যকালে সবকিছুর আগে নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম, গ্রাম-পাড়া বা মহল্লার নাম, সাতটি বার ও বারোটি মাসের নাম ইত্যাদি ভালো করে শিখে থাকে। অথবা বলা যায়, অভিভাবক কিংবা শিক্ষকরা এসব তাদের আগে শিখিয়ে থাকেন। শিশু ও বালক-বালিকারা শিক্ষাজীবনের শুরুতে এ ধরনের নামধামগুলো সময়ে-অসময়ে মুখে যতবার উচ্চারণ করে কিংবা খাতাপত্রে লেখে অথবা অভিভাবক-শিক্ষকরা তাদের শেখান, এতটা সময় পর্যন্ত আর কোনোকিছুই বোধকরি অত গুরুত্ব পায় না। শৈশব-বাল্যকালের শিক্ষাটা আজীবন তাদের পাথেয় হয়ে থাকে। মৌলিক একটি বিষয়ও কোনো কারণে শিশুশ্রেণীতে শেখা না হলে বা ভুল শিখলে প্রথম শ্রেণীতে, প্রথম শ্রেণীতে না হলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে কিংবা আরও পরে শেখা বা শোধরানো যায়। অন্তত প্রাথমিক বিদ্যালয় স্তর অতিক্রম করার আগে তা ভালো করে রপ্ত হবেই। কিন্তু একে একে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পুরোটা, এমনকি আঠারো-উনিশ বছর বয়সে দুই বছরের কলেজ স্তরের শিক্ষা শেষ করেও যাদের এমন হাল, তাদের নিয়ে আমাদের এখন থেকেই ভাবা উচিত।
২.
এবার উচ্চশিক্ষা বিষয়ে সাম্প্রতিক আমার সামান্য অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করি। ২০১৩-২০১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি (পাস ও অনার্স) স্তরে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ নামে ১০০ নম্বরের একটি কোর্স চালু করেছে। এটি সব শিক্ষার্থীর জন্যই বাধ্যতামূলক। ওই কোর্সে শ্রেণীকক্ষে পাঠদান, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনুষ্ঠিত চূড়ান্ত পরীক্ষা এবং কলেজে অনুষ্ঠিত অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের সঙ্গে আমিও সম্পর্কযুক্ত। কিছুদিন আগে এমনই একটি পরীক্ষার মোট ৬৮টি উত্তরপত্র মূল্যায়ন করি। লক্ষ্য করলাম, অনার্স শ্রেণীর দুটি বিষয়ে ৭৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২০ জনই (মোট পরীক্ষার্থীর এক-চতুর্থাংশের বেশি) কভার পৃষ্ঠায় ‘অনার্স’ লিখতে গিয়ে লিখেছে ‘অর্নাস’। আরও লক্ষ্য করলাম, কোর্সটির নাম লিখতে গিয়ে ‘অভ্যুদয়’ শব্দটির বানান সঠিকভাবে লিখতে পারেনি ১৬ জন। শব্দটি তারা কীভাবে লিখেছে এবং এর ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো আর এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে করছি না। একজন পরীক্ষার্থী শ্রেণী লিখেছে স্নাতক ‘সর্ম্মান’।
পণ্ডিতপ্রবর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তার সাহিত্যকর্মে একটি নীতিবাক্যের কথা প্রসঙ্গক্রমে অনেকবারই উল্লেখ করেছেন এবং তা হল ‘শতং বদ, মা লিখ’- শতবার বলিও, লিখিও না। কোনো বিষয়ে কোনো কথা বললে পরবর্তী সময় যদি তা মিথ্যা প্রমাণিত হয় তবে ‘কোন ব্যাটা বলেছে’ বললেই নিষ্কৃতি পাওয়া যায়। কিন্তু লিখলে ফাঁদে পা দেয়া হয়। সহজে দায় এড়ানো যায় না। এমনকি বিষয়টি আদালত পর্যন্তও গড়িয়ে যেতে পারে। উল্লিখিত নীতিবাক্যটি মনের মাঝে ধারণ করেই আজকের লেখাটি আমি তৈরি করেছি। আমার স্থির ধারণা, এটি স্থান-বিশেষের কেবল দু-একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অথবা আমাদের গোটা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। দেশে বিরাজমান শিক্ষাব্যবস্থার একটি নমুনামাত্র। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সংশ্লিষ্ট সবারই কম-বেশি অম্ল-মধুর এমন অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাবা-মা কিংবা অভিভাবক হিসেবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক হিসেবে, শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা বা তত্ত্বাবধানকারী মন্ত্রণালয়ের সচিব বা মন্ত্রী হিসেবে, এমনকি দায়িত্বশীল একটি সরকার হিসেবে- যাই বলি না কেন, আমরা কেউ-ই বোধকরি ইচ্ছা করলেই এর দায় এড়িয়ে যেতে পারি না।
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা ও লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা- কে শোনে কার কথা। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সংশ্লিষ্টদের কেবলই বাগাড়ম্বর ও জাহির করার প্রবণতা। প্রচার আর প্রচারণা। তবে শিক্ষাব্যবস্থার দিকে এখনই আন্তরিকতার সঙ্গে মনোযোগী না হলে জাতির ভবিষ্যৎ যে অন্ধকার, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। এমন পরিস্থিতির সূচনা কিন্তু দু-চার বছর, এমনকি এক-দুই দশক নয়, তারও আগে। এককভাবে বিশেষ কোনো সরকারকেও এ জন্য দায়ী করা ঠিক নয়। তবে সময় দ্রুত বয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা এখনই নজর দেবেন আশা করি। তা না হলে সামনে আমাদের ভয়াবহ পরিণাম অপেক্ষা করছে।
বিমল সরকার : সহকারী অধ্যাপক









ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com