ভিডিও গ্যালারি
বুধবার, ২৮ জুন, ২০১৭
  •   মুজাহিদ, সাকা চৌধুরীর রিভিউ আবেদন খারিজ: মৃত্যুদন্ড বহাল
  •   জর্ডানে দুই জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
 ঝঞ্ঝাট গজলডোবা ব্যারাজে
কালের কন্ঠে লিখেছেন অমিত বসু
Publish Date : 2017-04-21,  Publish Time : 06:53,  View Count: 87    2 months ago

আরবি ঘোড়ার কেশরের মতো পিচ্ছিল সময়। অধরা বিধুর। ধার ধারে না কারো। আসে, নিজের মতো চলে যায়। আদায় করার দায় কম নয়। চাইলেই দেয় না। ছিনিয়ে নিতে হয়। যাদের সে জোর নেই তারা অসহায়। পুরনো পেরিয়ে নতুন বছর ১৪২৪ এলো। বৈশাখের উষ্ণতায় অনেক আশ্বাস। বিশ্বাস নেই। শূন্য হাতে ফেরাতে পারে। ইচ্ছা হলে এতটাই ভরাবে যে উপচে পড়বে। বছরের মর্জিতে ভরসা নেই। জোর খাটাতে হবে। লাইন দিয়ে দাঁড়ানো সব ‘না’-কে হ্যাঁ করাটা প্রধান কাজ। এর মধ্যে অন্যতম তিস্তা চুক্তি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কথা দিয়েছেন, চুক্তি হবেই। সেটা হবে নির্বাচনের আগেই। ২০১৯ সালে কাছাকাছি সময়ে হাসিনা-মোদিকে ভোটে যেতে হবে। তিস্তা চুক্তিটি দরকার তার আগেই, যাতে ঐতিহাসিক সাফল্যের মাইলফলকটা পোঁতা যায় ভোটারদের সামনে। জোর গলায় বলতে অসুবিধা হয় না যে আমি পেরেছি। সিংহের গুহা থেকে সিংহকে বের করে এনেছি। উটকো ঝামেলায় গোলমালে পড়তে হয়নি। চুক্তিতে যিনি কাঁটা ছড়াচ্ছিলেন, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নিরস্ত। বাদ সেধে ক্লান্ত। মোদির দাপটে মমতার নেতৃত্বের জমাট খসেছে।

মমতা যে এতটা উঠেছেন সেটা ‘নো’ পাওয়ারের জোরে। সব আরজিতে, ‘না’। বামফ্রন্টকে ভেঙে গুঁড়িয়েছেন সেই জোরে। বামরা সিঙ্গুরে টাটার ন্যানো মোটরগাড়ির কারখানা খুলতে চেয়েছিল। জমি তৈরি করে কাজ শুরুর মুখে মমতার আপত্তি। তাঁর ‘না’-এর জোরে জেরবার বামরা শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়েছে, নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল হাব করার স্বপ্ন তো মাঠেই মারা গেছে মমতার আন্দোলনে। এ দুটি প্রকল্প সফল হলে পশ্চিমবঙ্গের চেহারা পাল্টাত। অন্য রাজ্যগুলো বলতে পারত না, বাঙালির দ্বারা কিচ্ছু হবে না। ওরা সস্তা রাজনৈতিক খেয়োখেয়ি করে মরুক, আমরা বরং এগিয়ে যাই।

ছয় বছরে মমতা পশ্চিমবঙ্গকে কোথাও পৌঁছে দিতে পারেননি। শিল্পে খরা, মরা অর্থনীতিতে নাভিশ্বাস। মরুভূমির মাঝখানে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রের টাকায় সুবিধা বিলোচ্ছেন। শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক থেকে যাকে পাচ্ছেন টাকা-পয়সা পুরস্কার দিচ্ছেন। গ্রামের সাধারণ মানুষকে দিচ্ছেন জামা, ছাতা, জুতা, সাইকেল, মাসিক ভাতা থেকে শুরু করে আরো কত কী। টাকা ফুরোলে আবার ছুটছেন দিল্লি। ধরছেন মোদিকে। এবার হাসিনা দিল্লি ছাড়তে না ছাড়তেই মোদির কাছে আছড়ে পড়েছেন ফুলের তোড়া নিয়ে। দাবি একটাই—টাকা চাই, আরো টাকা। সম্মান বাঁচাতে গর্বিত ঘোষণা, ভিক্ষা চাইছি না, হকের টাকা আদায় করতে এসেছি।

পশ্চিমবঙ্গের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া শিখে ছুটছে অন্য রাজ্যে বা বিদেশে চাকরির সন্ধানে। সন্তানশূন্য বাড়িতে অভিভাবকদের হাহাকার। মমতার আশ্বাস, এবার শিল্প হবেই। জুন মাসে চীন যাচ্ছি। পেইচিং, সাংহাইয়ে কমিউনিটি নেতাদের সঙ্গে কথা বলব। তাঁরাই পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগের ব্যবস্থা করে দেবেন। সঙ্গে শিল্পপতিরা যাবেন। তাঁরা গোটা ব্যাপারটা বুঝে নেবেন। চীনে গিয়ে মমতা কি বলবেন আপনারা সিপিএমকে ভুলে যান। আমিই এখন সাচ্চা কমিউনিস্ট। আমার পাশে থাকুন। পশ্চিমবঙ্গে জনপ্রিয়তা বাড়ান। আপনাদের চাপে আমেরিকা মুষড়ে পড়বে। মমতা এখন নিয়মিত বই লিখছেন। এসব কথার ব্যাখ্যা তিনি নিজেই করে দেবেন।

মমতা যা-ই বলুন বা করুন, তাঁর অভিধানে দেওয়া বলে কোনো কথা নেই। তিনি বলেন, যেখান থেকে যা পারো নাও, আরো নাও। সব কিছু চেটেপুটে খাও। কেউ কিছু চাইলেই ‘না’ বলে উড়িয়ে দাও। রাজনীতিতে নেওয়া বা পাওয়া মানে জিত, দিলে হার। হাসিনা ২০ কোটি মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে তৃষ্ণার বারি চেয়েছিলেন। তিস্তার মুক্তি দাবি করেছিলেন। চরম নিষ্ঠুরতায় অস্বীকার করেছেন মমতা। উল্টো বিকল্প প্রস্তাব দিয়ে দাবিটাকেই দুর্বল করার মতলবে ছিলেন।

মমতার ফাঁদে পড়ার জন্য বাংলাদেশও দায়ী। ২০১১ সালে মমতা মুখ্যমন্ত্রী হলে সে কী উল্লাস বাংলাদেশে। যেন আকাশের চাঁদ মাটিতে খসেছে। স্বপ্নে বিভোর সবাই। এবার আবদার করলেই সঙ্গে সঙ্গে তামিল। ধারণা আর বাস্তবে কতটা অমিল কিছুদিনেই সেটা বোঝা গেছে। মমতা স্বমূর্তি ধারণ করেছেন। তাঁর ঠোঁটে সবেতেই ‘না’-এর ফুলঝুরি। হতাশ বাংলাদেশ শেষমেশ ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, পরে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শরণাপন্ন। প্রধানমন্ত্রীরা একবাক্যে ‘হ্যাঁ’ বললেও ১৮০ ডিগ্রি বেঁকে মমতা। তাঁকে সোজা করবে কে।

মমতার এসব ঝামেলা পোহাতেই হতো না যদি বাংলাদেশ সরকার আগে থাকতে সচেতনতা বাড়াত। জলপাইগুড়িতে তিস্তার ওপর যখন গজলডোবা ব্যারাজ তৈরি হচ্ছে তখন বাংলাদেশ সরকার কী করছিল। তারা কি পরম কৌতুকে রাশিয়ান সার্কাস দেখছিল। আর মজা পেয়ে হাততালি দিচ্ছিল। তেষ্টার জল আটকাচ্ছে ভারত। কিছু বলার প্রয়োজন মনে করল না। সে সময় যারা বাংলাদেশ সরকারে ছিল তাদের আসামির কাঠগড়ায় টেনে আনা উচিত। জবাবদিহি করতে হবে। তিস্তা সমস্যা আজকের নয়। ১৯৮৩ থেকে চলছে টানাপড়েন। প্রথমে ঠিক ছিল ৩৯ শতাংশ জল পাবে ভারত। ৩৬ শতাংশ বাংলাদেশে যাবে। বাকি ২৫ শতাংশ নিয়ে আলোচনা চলবে। তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এরপর ঠিক হবে কী করা যাবে। নদীর মূল প্রবাহ ঠিক রাখতে কিছু পরিমাণ জল ছেড়ে রাখার কথাও হয়। ২০১১ সালে হাসিনা-মনমোহনের তিস্তা চুক্তিতে ঠিক হয়েছিল ৪২.৫ শতাংশ পাবে ভারত, ৩১.৫ শতাংশ যাবে বাংলাদেশের দিকে। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরে জলসংকটের দোহাই দিয়ে চুক্তি আটকে দেন মমতা।

তিস্তার জন্ম সিকিমে। উত্তরবঙ্গ হয়ে ঢুকেছে বাংলাদেশে। দৈর্ঘ্য ৪১৪ কিলোমিটার। সিকিমে ১৫০ কিলোমিটার, উত্তরবঙ্গে ১২৪ কিলোমিটার, বাংলাদেশে ১৪০ কিলোমিটার। তিস্তার অববাহিকার ৮৩ শতাংশ ভারতে, ১৭ শতাংশ বাংলাদেশে। ভারত থেকে যত নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে তার মধ্যে তিস্তার স্থান চতুর্থ। তিস্তা ধরে আছে বাংলাদেশের দুই হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা। এর অববাহিকায় বাস এক কোটি মানুষের। শুষ্ক মৌসুমে পাঁচ জেলার এক লাখ হেক্টর জমির চাষ মার খায় জলাভাবে। এ সময়ে মানে ডিসেম্বর থেকে মে মাসে ৫০ শতাংশ জল না হলে সব শেষ। পরিস্থিতিটা পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের চেয়েও ভয়ংকর। মমতা যখন নিজের রাজ্যের জলাভাবের কথা বলেন, বাংলাদেশের অবস্থাটা বিবেচনা করেন না। করলে তিস্তা চুক্তিতে না বলতে গলা কাঁপত। পশ্চিমবঙ্গের ওপারে জলাভাবে লাখ লাখ বাঙালি মরছে, সেটা সহ্য করতেন কী করে। বিপন্ন বাঙালির ব্যথা যাঁর বুকে বাজে না তাঁকে আর যা-ই হোক নেত্রী বলা যায় না।



লেখক : কলকাতার সাংবাদিক











ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com