ভিডিও গ্যালারি
বুধবার, ২৮ জুন, ২০১৭
  •   মুজাহিদ, সাকা চৌধুরীর রিভিউ আবেদন খারিজ: মৃত্যুদন্ড বহাল
  •   জর্ডানে দুই জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
 বহুমাত্রিক সমস্যায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা
কালেরকন্ঠে ড. মো. সহিদুজ্জামানের লেখা
Publish Date : 2017-04-20,  Publish Time : 06:39,  View Count: 205    2 months ago

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার মান প্রশ্নবিদ্ধ—এ নিয়ে জনমনে কোনো সংশয় নেই। প্রায়ই পত্রপত্রিকায় ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু, রোগী ও রোগীর স্বজনদের সঙ্গে চিকিৎসকদের সংঘর্ষ, চিকিৎসকদের কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ও কর্মবিরতির খবর পাওয়া যায়। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব খবরও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বলে মনে হয়। আর এসব খবর প্রচার করতে গিয়ে সাংবাদিকরা চিকিৎসকদের প্রতিপক্ষে পরিণত হয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয়। সুচিকিৎসার অভাবে প্রিয়জনদের হারানোর বেদনা, হাসপাতালে মানুষের অসহায়ত্ব, চিকিৎসার অভাবে কাতর যন্ত্রণা, চোখের সামনে বিনা চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু আমাদের মনকে নাড়া দেয়। রোগীর পেটে অস্ত্র রেখে সেলাই করা, শেওলাযুক্ত স্যালাইন রক্তে প্রবাহিত করা, মৃত ব্যক্তিকে আইসিইউতে রেখে বিল বাড়ানো, কর্মচারী ও নার্স দিয়ে অস্ত্রোপচার করানোর মতো ঘটনা অসত্য নয়। চিকিৎসকদের নির্ধারিত ফি পরিশোধ করেও প্রাপ্য সেবাটুকু না পাওয়া এবং সর্বোপরি একজন রোগীকে মানুষ হিসেবে গণ্য না করার বিষয়গুলো আমাদের চিকিৎসাসেবার মানকে অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। চিকিৎসকের প্রতি রোগী ও তার স্বজনদের আস্থা ও সম্মানবোধটুকুও নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে বলে মনে হয়।

চিকিৎসাবিদ্যা একটি মহান পেশা। এ পেশায় সাধারণত মেধাবীরাই এসে থাকে; যদিও বর্তমানে অনেক বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ থেকে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীরা চিকিৎসাবিদ্যায় পড়াশোনা করে এ পেশায় নিয়োজিত হচ্ছেন। যা-ই হোক, মহান এ পেশার সেবার মান নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা ও পর্যালোচনার ঝড় উঠেছে সাম্প্রতিক সময়ে। সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও জবাবদিহির বিষয়গুলো সামনে উঠে এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে ‘চিকিৎসাসেবা আইন ২০১৬’-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে।

বাংলাদেশে বহুমুখী সমস্যায় স্বাস্ব্যসেবার মান কমে গেছে। চিকিৎসকদের পেশাগত অদক্ষতা ও দায়িত্ববোধের অভাব এর অন্যতম কারণ। এ ছাড়া মানুষের অসচেতনতা, খাদ্যাভাস, খাদ্যে ভেজাল ও বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতি, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

অনেক সময় রোগী মারা গেলে অভিযোগ করা হয়, ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসা যে ভুল হয়েছে এটি রোগী বা রোগীর স্বজনরা কিভাবে নিশ্চিত হয় তার যথাযথ ব্যাখ্যা পত্রপত্রিকায় পাওয়া যায় না। আমাদের দেশে গ্রাম ও উপশহরগুলোতে ভালো চিকিৎসক না থাকায় মানুষ অসহায় হয়ে পল্লী চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হয়। পল্লী চিকিৎসকদের চিকিৎসাবিদ্যায় পরিপূর্ণ জ্ঞান না থাকায় ভুল রোগ নির্ণয়, অযাচিত ও অপর্যাপ্ত ওষুধের ব্যবহার রোগীর রোগকে জটিল করে ফেলে। মুমূর্ষু অবস্থায় শরণাপন্ন হয় এমবিবিএস চিকিৎসকের কাছে। এই অবস্থায় রোগীর মৃত্যু হলে ভুল চিকিৎসার দায় চাপে এমবিবিএস চিকিৎসকের ওপর।

আমাদের দেশে পানের দোকানেও অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যায়, যা বিশ্বের কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। বাইরে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ কেনা যায় না, এমনকি ভিটামিন ট্যাবলেট কিনতেও চিকিৎসকের অনুমতি লাগে। অনুমোদিত ফার্মেসি ছাড়া কোথাও ওষুধ বিক্রি হয় না এবং এসব ফার্মেসিতে ফার্মাসিস্ট নিয়োগ করা থাকে, যাঁরা ক্রেতাকে ওষুধের ধরন, কার্যকারিতা ও ব্যবহারবিধি সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দেন। অথচ আমাদের দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছেয়ে যাওয়া বিভিন্ন ওষুধের গুণগত মান ঠিক আছে কি না, মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে কি না তা সঠিকভাবে মনিটর করার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধে বাজার সয়লাব। এ ছাড়া জ্বর হলে প্যারাসিটামল, ব্যথা হলে ব্যথানাশক, কখনো বা নিজের পছন্দেই অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাই, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করি না। প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ কিনতে গেলে অনেক সময় দোকানদার একই গ্রুপের ওষুধের কথা বলে বেশি লাভের আশায় নিম্নমানের বা ভেজাল ওষুধ দিয়ে থাকে। এসব ওষুধ খেয়ে রোগী সুস্থ না হলে বা রোগ জটিল হলে দোষী হন চিকিৎসকরা।

দেশের হাসপাতালগুলোতে দালাল ও প্রতারকচক্র অনেক বেড়ে গেছে। এসব প্রতারকচক্র সরকারদলীয় রাজনীতি বা প্রভাবশালী চিকিৎসকদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকে। শহরের বাইরের হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের সঙ্গে শহরের হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের সমন্বয় না থাকায় এবং রোগী বা রোগীর স্বজনদের সঠিক তথ্য বা পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় অনেক রোগী চিকিৎসকের নাগাল পাওয়ার আগেই প্রতারণার শিকার হয়ে অর্থ ও জীবন দুটিই হারিয়ে ফেলে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

দেখা যায়, দূর-দূরান্ত থেকে সাধারণ মানুষ উন্নত চিকিৎসার আশায় শহরের হাসপাতালগুলোতে ভিড় জমায়। বাড়তি রোগীকে করিডর বা মেঝেতে জায়গা দিতে গিয়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় বিঘ্ন ঘটে। এই ভিড় কমাতে হলে উপজেলাগুলোতে সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। উপজেলা হাসপাতাল ও জেলা হাসপালগুলোকে সমন্বয়ের মাধ্যমে সেবা দিতে হবে। উপজেলায় চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয় এমন জটিল কোনো রোগীকে জেলা শহরে পাঠিয়ে উন্নত চিকিৎসা দিতে হবে। এ ছাড়া অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

দেশের প্রত্যেক ব্যক্তি বা পরিবারকে বিভিন্ন প্যাকেজে সরকার অনুমোদিত স্বাস্থ্যবীমার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। চিকিৎসকের ফি এবং একজন চিকিৎসক প্রতিদিন বা সপ্তাহে সর্বোচ্চ কয়জন রোগী দেখতে পারবেন তার সংখ্যাও নির্ধারণ করতে হবে। এসব বিষয়ে চিকিৎসক নেতাদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং শাস্তির বিধান রেখে আইন করতে হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিভিন্ন রিপোর্টে কোনো ভুলের কারণে রোগীর ক্ষতি হলে সেই রিপোর্টের সিগনেটরি চিকিৎসককেও আইনের আওতায় আনতে হবে।

চিকিৎসকদের শুধু প্র্যাকটিসমুখী হলে চলবে না, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় অবশ্যই মনোনিবেশ করতে হবে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ছাড়া একজন চিকিৎসক কখনোই বিশেষজ্ঞ হতে পারেন না। তবে আমাদের দেশের চিকিৎসকরা অবশ্যই মেধাবী ও বিচক্ষণ। দেশ ও বিদেশে অনেকেরই খ্যাতি রয়েছে। তাঁদের অবদানে শিশুমৃত্যু উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, দেশের প্রতিটি শিশুকে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে এবং রোগ নির্ণয়ে প্রযুক্তিগত ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে।

চিকিৎসা পেশা সবার জন্য নয়। মেধাবীরা এ পেশায় না এলে ভালো চিকিৎসক পাওয়া সম্ভব নয়। মানসম্মত চিকিৎসক তৈরি করতে শিক্ষা ও গবেষণার মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষাপদ্ধতির মাধ্যমে চিকিৎসকদের প্র্যাকটিসের অনুমতি প্রদান করতে হবে, যা বিশ্বের প্রায় সব দেশেই আছে। দেশে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও অন্যান্য চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সেবার মান নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ জরুরি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিরেক্টর জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসকে মেডিক্যাল সার্ভিস ও এক্সটেনশন সার্ভিস দুই ভাগে ভাগ করে একদিকে শুধু চিকিৎসাসেবা; অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে অন্যান্য দিক পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। এক্সটেনশন সার্ভিসে গবেষণা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলো পরিচালিত হবে, যেখানে চিকিৎসক ও অন্য পেশাজীবীরা সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করার সুযোগ পাবেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন অধিদপ্তরগুলোর মধ্যে এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত বিষয়ে অবশ্যই সমন্বয় বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সচিব পদে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার থেকে অথবা একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞকে নিয়োগ প্রদান করতে হবে, যিনি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কাজে মন্ত্রীকে যথাযথ পরামর্শ ও সহযোগিতা দিতে পারবেন।
সর্বোপরি চিকিৎসকদের সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে সেবা দিতে হবে। আন্তরিকতা ও নৈতিকতা দিয়ে জনগণের পাশে দাঁড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, জীবে দয়া করে যে জন, সে জন সেবিছে ঈশ্বর।

লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, প্যারাসাইটোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

szaman@bau.edu.bd










ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com