ভিডিও গ্যালারি
মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০১৭
  •   মুজাহিদ, সাকা চৌধুরীর রিভিউ আবেদন খারিজ: মৃত্যুদন্ড বহাল
  •   জর্ডানে দুই জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
 নাগরিক নববর্ষ ও অন্তর্নিহিত স্ববিরোধিতা
কালেরকন্ঠে আহমদ রফিকের লেখা
Publish Date : 2017-04-20,  Publish Time : 06:39,  View Count: 105    4 months ago

বৈশাখী নববর্ষের উৎসব-অনুষ্ঠান মূলত গ্রামীণ চরিত্রের। অশ্বত্থ-বটের নিবিড় ছায়ায়, কখনো বা খোলা মাঠে শামিয়ানা টানিয়ে পহেলা বৈশাখের উৎসব-আয়োজন গতানুগতিক গ্রামীণ জীবনে ব্যতিক্রমী আনন্দের দিন হিসেবে বরাবর বিবেচিত হয়ে এসেছে। এর চরিত্র সম্প্রদায় নির্বিশেষ ও সর্বজনীন। শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী থেকে গ্রামের সব বয়সী মানুষের এতে অংশগ্রহণ, নর-নারী নির্বিশেষে।

এ উৎসব একাধারে প্রয়োজন ও বিনোদনের। বিনোদন প্রধানত কম বয়সীদের পছন্দমতো কেনাকাটায়—বাঁশি, বাহারি বেলুন, ছোট্ট টানাডোল, ছুরি, পেনসিল, রঙিন ফিতা ও কাচের চুড়ি ইত্যাদি। তা ছাড়া মাটির ছোট্ট পুতুল, ঘোমটা পরা বউ থেকে মৃিশল্পের নানা জিনিস মেলার প্রধান আকর্ষণ।

বয়স্কদের নজর রকমারি মিষ্টিমিঠাই এবং তরুণী-গৃহবধূদের আকর্ষণ শাড়ি, ফিতা, কানের দুল থেকে অনুরূপ রকমারি জিনিসে। একটি দিনই তো, খোলা মাঠে বৈশাখী হাওয়ায় কিছুক্ষণের জন্য মুক্তির আস্বাদ। আবার একদিকে কৃষক হাল-লাঙলের সরঞ্জাম পরীক্ষা করে দেখছে, দামদস্তুর করছে চাষাবাদে নতুন সরঞ্জাম যোগ করবে বলে।

মেলায় বিকিকিনির পাশাপাশি বছরের প্রথম দিনে কর্মব্যস্ত সময় থেকে একটু অবসর, একটু বিনোদন, সেই সঙ্গে কুশল বিনিময় যেন সামাজিক সম্প্রীতির নিদর্শন। আলাপ চলে মাঠের চাষ, বীজ বোনা, আকাশের হালচাল নিয়ে। এমন ছিল গ্রামে পহেলা বৈশাখী অনুষ্ঠানের চিত্রচরিত্র। হালখাতা, ব্যবসা, বিকিকিনির মধ্যে এর সামাজিক-সাংস্কৃতিক চরিত্রটি ছিল সম্প্রীতির ও নান্দনিকতার।

ঐত্যিবাহী নববর্ষের উৎসব-অনুষ্ঠান এক দিনের হলেও গ্রামে লোকসংস্কৃতির নানা মাত্রিক প্রকাশ এই ধারায় নিত্যদিনের হয়ে উঠেছে। তা যেমন বাংলা দিন-তারিখ, মাস-সনের প্রাত্যহিক ব্যবহারে, তেমনি তা সচল পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে। বাংলা সন-তারিখ বাংলার গ্রামীণ জীবনে এক সর্বজনীন ব্যবহারিক সত্য। লোকসংস্কৃতির শৈল্পিক প্রকাশ যেমন মরমি, মারফতি গানে, ভজন কীর্তনে বা বাউলগীতিতে তেমনি এর ভিন্ন পরিচয় নকশিকাঁথা বা নকশি পিঠার সুশ্রী কারুকার্যে। ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া সুলভ পল্লীগীতিও লোকসংগীতের প্রধান ধারা। মানবিক চেতনাও সম্প্রীতিবাদী অসাম্প্রদায়িক চেতনা গ্রামীণ সংস্কৃতি তথা জনসংস্কৃতির মর্মবস্তু বলা চলে। রবীন্দ্রনাথের বিবেচনায় গ্রামীণ সংস্কৃতির শুদ্ধ প্রকাশ এর সহজ সারল্যে, যা একসময় অর্থনৈতিক তাড়নায় শুকিয়ে যেতে থাকে।

দুই.

দেশবিভাগ-উত্তর পাকিস্তানি শাসনামলে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি সংস্কৃতি, লোকসংস্কৃতির বিকাশ কিছুটা ব্যাহত হয়েছে শাসকশ্রেণির সংকীর্ণ, সম্প্রদায়বাদী নীতির কারণে। নববর্ষের উৎসবও সে বিরূপতার শিকার। সেসব প্রধানত ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রতাপে। লৌকিক সংস্কৃতি উঠে আসে প্রাদেশিক রাজধানীতে, সমষ্টিগত আয়োজনে এবং তা প্রধানত বাংলা নববর্ষের হাত ধরে। ধীরগতিতে এর পায়ে পায়ে চলা হলেও এসবে প্রকাশ পেয়েছে সমাজ-সংস্কৃতির অধিকার রক্ষার প্রতিবাদী লড়াই। সংস্কৃতির অঙ্গনের সে লড়াইয়ে একসময় জড়িয়ে পড়ে রবীন্দ্রসংগীতের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও।

স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনৈতিক আদর্শের বিষমগতির টানে মধ্যবিত্ত ও বিত্তবান শ্রেণির অস্বাভাবিক দ্রুত অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটে। এর প্রভাব পড়ে সমাজে, সংস্কৃতি অঙ্গনে। সম্পন্ন ও বিত্তবৈভবে প্রতিষ্ঠিত এসব শ্রেণির তরুণ ও যুবসমাজের সাংস্কৃতিক তৃষ্ণা মেটাতে গ্রামীণ নববর্ষের অনুষ্ঠান ও লোকসংস্কৃতির কিছু কিছু উপকরণ উঠে আসে রাজধানী শহরে, যা ক্রমে হয়ে ওঠে মহানগর। আসে বৈশাখী মেলা ও নানা মাত্রিক শিল্পকর্ম নিয়ে।

এরই মধ্যে মূলত রাজধানী ঢাকায় ও প্রধান নগর-বন্দরে পুঁজিবাদী ভোগবাদী সমাজব্যবস্থার প্রাধান্য প্রকাশ পেতে শুরু করেছে মূলত সাম্রাজ্যবাদী বিশেষত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতির প্রভাবে ও তার অন্ধ অনুসরণে। এতে বিত্তবান পরিবারের তরুণ-যুবা ও মধ্য বয়সী শ্রেণির প্রাধান্য। ঘটে বৈশাখী অনুষ্ঠানসহ উঠে আসা গ্রামীণ সাংস্কৃতিক উপকরণের চরিত্র বদল এবং তা বাণিজ্যিক ধারায় মুনাফাবৃত্তিতে।

একদিকে নকশিকাঁথার দুর্মূল্য বাজারজাতকরণ এবং নকশিকাঁথার অনুকরণে কাঁথাস্টিচ শাড়ি ও নারী-পুরুষের উপযোগী পোশাক বাণিজ্যের দুর্মূল্য প্রসারে গ্রামীণ সংস্কৃতির চরিত্র বদল। অন্যদিকে একই ধারায় সুশ্রী নকশা-কাটা পিঠা ও অনুরূপ পিঠা-পায়েস সংস্কৃতির বাণিজ্যিক প্রকাশ রাজধানীসহ দু-একটি নগর-বন্দরে। আর এগুলোকে কেন্দ্র করে মহানগরে গড়ে উঠছে পুঁজিবাদী ধারায় চেইনস্টোর ব্যবসা-বাণিজ্য। গ্রামীণ সংস্কৃতির এ নাগরিক বিপর্যয় ঘটেছে মুনাফা-মানসিকতার ব্যাপক বিস্তারে।

শুধু গ্রামীণ সংস্কৃতির ভিত্তিতেই নয়, নাগরিক সংস্কৃতির আধুনিকতার নামে ফাস্ট ফুড, জাংক ফুড ছাড়া ঈদ বা পূজা অনুষ্ঠানের মতো বৈশাখী নববর্ষের উৎসব ঘিরেও চলছে নানা কারুকার্যখচিত স্লোগান ছাপা পুরুষ পোশাকের পাশাপাশি অনেক উচ্চমূল্যের বিচিত্র মহিলা-ব্যবহার্য পোশাকের মুনাফা বাণিজ্য। শুদ্ধ সংস্কৃতি সেখানে আকাশের অদৃশ্য চাঁদ। সংস্কৃতি বাণিজ্যে বাঁধা পড়ে যায়।

পহেলা বৈশাখের টানে এ সময়পর্ব হয়ে উঠেছে আধুনিকতার নামে বাণিজ্যিক দিন। সচ্ছল পরিবার মাত্রের জন্যই এ দিনগুলোতে বড় হয়ে ওঠে কেনাকাটার ধুমধাম বাধ্যবাধকতা, সংগতি থাকুক বা না থাকুক। পশ্চিমবঙ্গীয় সিরিয়াল ছবির জনপ্রিয় নায়িকা ‘পাখি’র ব্যবহৃত পোশাকের মতো দুর্মূল্য পোশাক কিনে দিতে না পারায় বাংলাদেশি কিশোরীর আত্মহত্যা বুঝিয়ে দিচ্ছে এ দেশে সংস্কৃতির যাত্রা কোন পথে। পোশাক-সংস্কৃতি, অলংকার-সংস্কৃতি দেশের সচ্ছল সমাজে শুভ নববর্ষের ভিন্ন এক শুভ চরিত্রই প্রকাশ করছে। ঘটছে বিত্তবান সংস্কৃতির নাগরিক প্রকাশ।

তিন.

বাংলাদেশের সচ্ছল মধ্যবিত্তসহ এলিট ও বিত্তবান শ্রেণির বৈচিত্র্যসন্ধানী ভোগবাদী চরিত্রে বিদ্ধ বৈশাখী নববর্ষের ‘একদিন কা’ অনুষ্ঠান, এর সীমাবদ্ধতা ও স্ববিরোধিতা নিয়ে। দুস্থ গ্রাম ও অতিপুষ্ট মহানাগরিক বৈষম্য ঘোচাতে সংস্কৃতিচর্চার গ্রাম-নগর পারাপারের বহু কথিত লড়াইটা এখন বিষম যাত্রার চোরাবালিতে অদৃশ্য প্রধানত শ্রেণি-বিশেষের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাবের কারণে।

ঢাকার রাজপথে অনুষ্ঠিত পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা মূলত বৈচিত্র্য সন্ধানের প্রতিফলন। এ যাত্রায় যদি অমঙ্গল-অশুভ প্রতিহত করার নান্দনিক লক্ষ্য থাকে, তবে তার প্রতীকী প্রকাশ শ্রেণিস্বার্থকে ঘিরে, যেখানে নাগরিক বস্তিবাসী বা নিম্নবিত্ত শ্রেণির উপস্থিতি লক্ষ করা যায় না। মহানাগরিক নববর্ষের উৎসব-অনুষ্ঠান গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির সুস্থ চরিত্র ধারণ করে না। নাগরিক নববর্ষের স্ববিরোধিতায় তা হারিয়ে গেছে।

তাই পহেলা বৈশাখে ভোরের স্নিগ্ধতা মেখে সুদর্শন পোশাকে সজ্জিত বাঙালি এলিট শ্রেণির সদস্য একবেলা পান্তা ভাত খেয়ে বা মুখে তুলে (দুর্মূল্য ইলিশের সঙ্গে পান্তাও একরকম স্ববিরোধিতা) আত্মবিরোধী আচরণের আত্মপ্রসাদী প্রকাশ ঘটায়, যা গ্রামের দুস্থ পান্তাভোজী সংস্কৃতির প্রতি উপহাসই বটে। পান্তা ভাত যদি খেতেই হয় সহানুভূতির প্রতীক হিসেবে, তাহলে তা গ্রামের দুস্থ মানুষগুলোর সঙ্গে এক পঙিক্ততে বসে খাওয়াই তো আদর্শরূপ আচরণ। বিপরীত ধারায় লোকদেখানো একবেলার আচরণ সুস্থ সংস্কৃতির ধারক নয়।

বরং এ বিষয়ে পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রায় স্লোগান তোলা উচিত গ্রাম-নগরের ব্যবধান কমানোর দাবিতে, যাতে দুস্থ গ্রামীণ জনতা পান্তার বদলে গরম ভাত ইলিশ ভাজা সহযোগে খেতে পারে। সংস্কৃতিচর্চা দুস্থ গ্রামীণ জীবনের অবস্থা পরিবর্তনে সুস্থ দিকনির্দেশ দিতে পারে। পরিবর্তে মহানগরে সংস্কৃতিচর্চার প্রধান ধারাটি সচ্ছল শিক্ষিত মধ্যবিত্তসহ বিত্তবান শ্রেণির নান্দনিক আকাঙ্ক্ষা পূরণের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

এ সাংস্কৃতিক আচরণ ঢাকার নববর্ষ অনুষ্ঠানে বেশ কয়েক দশক আগে শুরু হয় সুদর্শন রমনায় শুঁটকি ভর্তা-পান্তার আহারে। এখন তা পরিণত ইলিশ-পান্তায়। ফলে চৈত্র-বৈশাখে ইলিশের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ে মহা অভিযোগ অসচ্ছল নাগরিক মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের। কারণ ইলিশ এখন তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এলিট ও বিত্তবান শ্রেণির এই মানসিক বিলাসিতা প্রকৃত বাঙালিয়ানা বা জাতীয় সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে না।

অন্য এক গুরুত্বপূর্ণ স্ববিরোধিতা পহেলা বৈশাখের পরদিন থেকে সরকারি-বেসরকারি সর্বস্তরে জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে বৈশাখী বর্ষের বদলে খ্রিস্টীয় বর্ষ—জানুয়ারি-ডিসেম্বর প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গী হয়ে থাকে, যেমন ঘরে তেমনি বাইরে অর্থাৎ অফিস-আদালতে, নিজ নিজ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে।

বর্ষব্যাপী ঔপনিবেশিক রাজভাষা-সংস্কৃতি আমাদের ব্যক্তি জীবনে, জাতীয় জীবনে প্রবল দাপটে সচল থাকে। বাদ যায় না সর্বোচ্চ শিক্ষায়তন বা সর্বোচ্চ বিচারালয়। অধ্যাপক-বিচারক-পেশাজীবী—সবাই এ বিদেশি সংস্কৃতির মহাফেজখানায় বন্দি। রাজনৈতিক-রাষ্ট্রনৈতিক শাসন মাতৃভাষা-সংস্কৃতির বদলে সাবেক বিদেশি শাসক শ্রেণির রাজভাষা সাংস্কৃতিকেই জীবনের সর্বক্ষেত্রে ধারণ ও লালন করে চলেছে।

একইভাবে আবাসন খাত থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব প্রতিষ্ঠানের নামকরণে একদা বাঙালিয়ানা এখন অবসর নিয়েছে। সে আসনে এখন ইংরেজির প্রবল আধিপত্য তেমনি বিজ্ঞাপনে, নামফলকে, এমনকি পারিবারিক অনুষ্ঠান বিয়ের আমন্ত্রণপত্রেও ইংরেজির অনুপ্রবেশ ঘটেছে বাঙালি জাতীয় চেতনাকে পরাজিত করে, ভাষিক সংস্কৃতিকে জীবন থেকে নির্বাসনে পাঠিয়ে। এদিক থেকে বাদ যায় না নাগরিক নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণি তাদের জীবন পরিচর্যায় ও বৈষয়িক চরিত্রে। ইংরেজি-বাংলার উদ্ভট মিশ্র ব্যবহার তাদের বৈশিষ্ট্য।

মহানগরে শ্রেণি বিশেষের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত বর্ণাঢ্য বাংলা বর্ষবরণ বহিরঙ্গের সজ্জায় যেমনই জমকালো হোক, তার আদর্শিক ও অন্তর চরিত্র ঐতিহ্যবাহী বাঙালি জাতীয়তাবোধের ফাঁপা ও ভেজাল চরিত্রের প্রকাশই নিশ্চিত করে। এ উৎসব অনুষ্ঠান একান্তই সচ্ছল-উচ্চ মধ্যবিত্ত ও তদূর্ধ্ব বিত্তবান শ্রেণির আত্মপ্রসাদী কর্মযজ্ঞ বৈ আর কিছু নয়। মঙ্গল শোভাযাত্রাও এমন এক সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণের তৎপরতা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। লক্ষণীয়, এতে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা।

সাম্রাজ্যবাদী করপোরেট পুঁজি-প্রভাবিত স্থানীয় বিত্তবান সদস্যদের বিদেশি সংস্কৃতিনিষ্ঠ সংস্কৃতিচর্চায় ইউনেসকো সমর্থন জোগাবে এটাই স্বাভাবিক। জাতীয় সংস্কৃতির নামে সাম্রাজ্যবাদী করপোরেট সাংস্কৃতিক চেতনা প্রভাবিত সংস্কৃতিচর্চার প্রসারিত রূপ নির্ভেজাল জাতীয় চরিত্রের নয়। প্রসঙ্গত বলা যায়, এ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তথা আদিবাসী সমাজে অনুষ্ঠিত তাদের উৎপাদন সংশ্লিষ্ট নিজস্ব বর্ষবরণে যে নিখাদ সর্বজনীন আত্মচেতনার সারল্য প্রকাশ, তা আদর্শ বিবেচনায় অনুসরণযোগ্য মনে হয়, না থাকুক তাতে বিত্তবান শ্রেণি-প্রাচুর্যের সমারোহ। এর সঙ্গে রয়েছে একসময়কার গ্রামবাংলার নববর্ষ উদ্‌যাপনের চারিত্রিক মিল।

আমাদের মহানাগরিক বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে তার জমকালো বর্ণাঢ্য রূপ সত্ত্বেও জাতীয় জীবনের সর্বমহলে তথা সর্বশ্রেণিতে স্বচ্ছন্দ বিচরণে সর্বজনীন চরিত্র অর্জন করতে পারেনি বলে জাতীয় উৎসবের মর্যাদা অর্জন তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবু প্রতি বৈশাখে আমরা বৈশাখী নববর্ষকে জাতীয় উৎসবের মর্যাদায় দেখার দাবি জানাই। ভুলে যেতে চাই এর বিত্তবৈভবসম্পন্ন শ্রেণিচরিত্রের সীমাবদ্ধতার কথা, যা বাঙালিয়ানার পরিচিতি পেয়েছে।

সত্যিকার অর্থে নাগরিক নববর্ষকে জাতীয় উৎসবের চরিত্রে দিতে হলে নাগরিক নববর্ষের ইতিবাচক চরিত্রগুলোকে গ্রাম-নগর পারাপারের মাধ্যমে সর্বজনীন রূপ দিতে হবে। সংস্কৃতির এ চর্চাকে শ্রেণিসচেতনতা নিয়ে প্রসারিত করতে হবে গ্রামীণ জনজীবনের মাটির দাওয়ায় বা অশ্বত্থ-বটের নিবিড় ছায়ায়। পরিশীলিত জনসংস্কৃতির চরিত্রে সমৃদ্ধ হতে হবে নাগরিক নববর্ষের উৎসব-অনুষ্ঠানকে। সে জন্য দরকার বর্তমান চর্চার কিছু আমূল পরিবর্তন।

জাতীয় পর্যায়ে বৈশাখী বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে বিশেষ শ্রেণিচেতনা ও শ্রেণিচরিত্রের বন্ধন থেকে মুক্ত করতে হবে। এ কাজ সহজ হতে পারে শ্রেণিসচেতন সংস্কৃতিসেবীদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে। গ্রাম-নগরের সাংস্কৃতিক বৈষম্যের অবসান ঘটানোই হবে এ ক্ষেত্রে মূল্যবান সাংস্কৃতিক কর্তব্য ও লক্ষ্য।

আমাদের সংস্কৃতিচেতনা কতটা ঐতিহ্য বিযুক্ত, কতটা প্রগতিবিরোধী ও প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠেছে তার প্রমাণ সাম্প্রতিক মূর্তি ভাস্কর্য বিতর্ক, যা শিল্পকলার চর্চায় অন্ধ সংকীর্ণতার প্রকাশ বৈ কিছু নয়। ধর্মীয় রক্ষণশীলতা সম্প্রতি উদার সাংস্কৃতিক চর্চাকে গ্রাস করতে উদ্যত। এ প্রবণতা রুখতে হবে। এটা একুশের চেতনা-মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী। এমনকি জাতীয় চেতনারও। ঢাকায় বর্ষবরণে লক্ষাধিক মানুষের সুস্থ সংস্কৃতিচেতনা ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের সংগ্রামে আদর্শনিষ্ঠ হতে পারলে ধর্মীয় রক্ষণশীলতার অনাধুনিকতাকে প্রতিহত করা সম্ভব হবে। নাগরিক বর্ষবরণের সংস্কৃতি কি সে পথ ধরবে সুস্থ দেশজ সংস্কৃতি ধারাকে বাঁচাতে?

 

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী









ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com