ভিডিও গ্যালারি
রবিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১৭
  •   মুজাহিদ, সাকা চৌধুরীর রিভিউ আবেদন খারিজ: মৃত্যুদন্ড বহাল
  •   জর্ডানে দুই জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
বৈরুতের ট্যাক্সি ড্রাইভার
নয়াদিগন্তের অনুবাদ পাকিস্তানের জং পত্রিকায় হামিদ মীরের লেখা
Publish Date : 2017-04-20,  Publish Time : 06:39,  View Count: 33    a week ago

আবু জাফর, বৈরুতের এক ট্যাক্সি ড্রাইভার, যে আমাকে বৈরুত থেকে দামেস্ক নিয়ে যাচ্ছিল। আমাদের ট্যাক্সি লেবানন থেকে সিরিয়ায় প্রবেশ করলে আবু জাফর বহু দূরে দৃষ্টিসীমার মধ্যে আসা পাহাড়গুলোর দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, এটা গোলান এলাকা, যা ইসরাইল দখল করে রেখেছে। আবু জাফর শীতল নিঃশ্বাস ছাড়ল। বলল, ইসরাইল আমেরিকার সাথে তাল মিলিয়ে বৈরুত ও বাগদাদ ধ্বংস করে দিয়েছে। এখন তারা দামেস্ক ও তেহরান হয়ে মক্কা পৌঁছার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর দুর্ভাগ্যবশত তারা শুধু আমেরিকা নয়, বরং অনেক মুসলমানেরও সহযোগিতা অর্জন করবে। আমি অনেকণ ধরে চুপচাপ তার আরবি সুরে ইংরেজি বর্ণনা শুনলাম। কিন্তু ও যখন বলল, ইসরাইল বৈরুত ও বাগদাদের পরে দামেস্ক ধ্বংসের পরিকল্পনা এঁটেছে, তখন আবু জাফরের কাছে জানতে চাইলাম, দামেস্কে ইসরাইল কী চায়? আবু জাফর তৎণাৎ উচ্চস্বরে বলে উঠল, মুসলমান নিজেদের ইতিহাস ভুলে গেছে, ইহুদি ইতিহাস ভোলে না। তারা সালাহউদ্দিন আইয়ুবির মাজারে পৌঁছতে চায়। সালাহউদ্দিন ক্রুসেড যুদ্ধের সময় বায়তুল মুকাদ্দাসে ইসলামি পতাকা উড়িয়েছিলেন। এ কথা শুনে চুপ থাকলাম। আবু জাফরের সন্দেহ হলো, সম্ভবত আমি তার কথায় একমত হচ্ছি না। সে তার বাম হাতের আঙুল বুকে রেখে বলল, ‘আমি আবু জাফর, ইসরাইলি সৈন্য যখন বৈরুতে অনুপ্রবেশ করল, তখন আমি তাদের দিকে পাথর ছুড়ে মারা যুবকদের মাঝে ছিলাম। আমাকে গ্রেফতার করে ইসরাইলের কারাগারে বন্দী করা হয়। ইসরাইলের কারাগারে জায়নবাদকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমার চোখে যা ধরা পড়ে, তোমাদের এবং অনেক মুসলিম দেশের শাসকদের চোখে তা ধরা পড়ে না।’ কথা বলতে বলতে আমরা দামেস্কের কাছে পৌঁছে গেলাম। আবু জাফর বারবার তাগাদা দিচ্ছিল, আমি যেন সোজা দামেস্ক এয়ারপোর্টে সৌদি এবং অতি দ্রুত সিরিয়া থেকে বের হয়ে যাই। কিন্তু আমি দামেস্কে এক দিনের জন্য থেকে যেতে চাচ্ছিলাম, যাতে সাইয়িদা জয়নাব বিনতে আলী রা: ও সালাহউদ্দিন আইয়ুবির মাজারে ফাতেহা পড়তে পারি। লেবানন ও ইসরাইলের যুদ্ধের সময় তিন সপ্তাহ ধরে আবু জাফর আমার জন্য ট্যাক্সি ড্রাইভার হওয়া ছাড়াও দোভাষী ও গাইডের কাজ করেছিল। সে আমাকে অত্যন্ত সমবেদনার সুরে বোঝাতে গিয়ে বলে, দামেস্ক এয়ারপোর্ট বিশ্বের অন্য এয়ারপোর্টগুলো থেকে ভিন্ন। এখানে বাড়াবাড়ি রকমের অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা হয়। তোমার কাছে রিজার্ভেশন নেই, আবার তোমার কাছে রয়েছে পাকিস্তানি পাসপোর্ট। আমার অনুরোধ, দামেস্কে এক রাত থাকার চেয়ে সোজা এয়ারপোর্ট চলে যাও এবং এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করো।
আমি জানতে চাইলাম, এখানে পাকিস্তানি পাসপোর্টের ওপর কী ধরনের আপত্তি তোলা হয়? সে বলল, আপত্তি পাকিস্তানের ওপর নয়, আপত্তি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের ওপর, যাকে ইসরাইলের বন্ধু মনে করা হয়। কেননা শিমন প্যারেজ তার খুব প্রশংসা করেন। আবু জাফরকে তার পরামর্শের জন্য কৃতজ্ঞতা জানালাম এবং বললাম সাইয়িদা জয়নাব রা:-এর মাজারের কাছে অবস্থিত হোটেলে পৌঁছিয়ে দিয়ে তুমি বৈরুত ফিরে যাও। সে আমাকে হোটেলে নামিয়ে দিলো। ভাড়া নিয়ে যাওয়ার সময় ইংরেজিতে বলল, সালাহউদ্দিন আইয়ুবির মাজারে গিয়ে অবশ্যই এই দোয়া করবে, ইহুদিরা যেন এ মাজার পর্যন্ত পৌঁছতে না পারে। আবু জাফরের সাথে আমার এ কথাবার্তা হয়েছিল ২০০৬ সালে, যখন লেবানন ও ইসরাইলের যুদ্ধে তিন সপ্তাহ অবস্থান করার পর ফিরে এসেছিলাম। ২০১১ সালে সিরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে আবু জাফরের কথা মনে পড়ে। ভেবেছিলাম, এ গৃহযুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। ছয় বছর অতিবাহিত হলো। গৃহযুদ্ধ শেষ হয়নি। লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষ মারা গেছে এ যুদ্ধে। ৭ এপ্রিল শুক্রবার রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে আমেরিকা সিরিয়ায় ৫৯টি টোমাহক পেণাস্ত্র নিপে করেছে। এটা ওই পেণাস্ত্র যা ১৯৯৮ সালে তালেবানের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানে ব্যবহার করা হয়েছিল। আমেরিকার দাবি, তারা সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের প থেকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার রুখতে পেণাস্ত্র দিয়ে হামলা করেছে। অথচ বাশার আল আসাদ রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা অস্বীকার করছেন। এটা ওই ভূখণ্ড যেখানে একসময় হজরত খালেদ বিন ওয়ালিদ রা:-এর নেতৃত্বে মুসলমানরা নিজেদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি শক্তিশালী হিরাকিয়াসের বাহিনীকে পরাজিত করেছিল। ওই যুদ্ধে হজরত জাররার রা: তাঁর বীরত্বের প্রকাশ ঘটাতে গিয়ে শত্র“সৈন্যের মাঝে ঢুকে পড়েন এবং গ্রেফতার হন। ওই যুদ্ধেই তাঁকে উদ্ধারের জন্য তাঁর বোন হজরত খাওলা রা: বীরত্বের চরম উৎকর্ষ প্রদর্শন করেন। যে যুদ্ধে ইসলামি বাহিনীর পতাকায় ঈগল ছিল। এ ঈগল আজও বেশ কয়েকটি আরব দেশের পতাকায় দেখা যায়। কিন্তু আফসোস, কিছু আরব নেতা ঈগলের দৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়ে গেছেন। তারা বন্ধু ও শত্র“ চিনতে পারছেন না। বাশার আল আসাদ তার বিরোধীগোষ্ঠীর ওপর জুলুম-নির্যাতন করছেন। এ পরিপ্রেেিত ইসলামি দেশগুলোর সংগঠন ওআইসি বিষয়টিকে তাদের ফোরামে উত্থাপনের পরিবর্তে সিরিয়ার সদস্যপদ বাতিল করেছে। ন্যাটো ছাড়া জাপান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও ইসরাইল সিরিয়ায় মার্কিন পেণাস্ত্র হামলাকে সমর্থন করেছে। অপর দিকে রাশিয়া, চীন, ইরাক ও ইরান এ হামলার নিন্দা করেছে। ইন্দোনেশিয়া সিরিয়া ও আমেরিকা, উভয়েরই আগ্রাসনকে নিন্দনীয় অভিহিত করেছে। সিরিয়ায় মার্কিন হামলার পর মুসলিম দেশগুলোতে বিভক্তি স্পষ্ট রূপ নিয়েছে। আমার বারবার আবু জাফরের কথা মনে পড়ছে। আমার এটাও জানা আছে, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের যুবসম্প্রদায় উভয় পরে সমর্থক হয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। বাশার আল আসাদের সমর্থক যুবকদের ইরানের পথ দিয়ে সিরিয়ায় পাঠানো হয়েছে, আর বাশার আল আসাদের বিরোধী যুবকদের তুরস্কের পথ দিয়ে সিরিয়ায় পাঠানো হচ্ছে।
সিরিয়া ও আমেরিকার এ বিবাদে পাকিস্তানকে বেশ সতর্ক থাকতে হবে। কেননা জেনারেল রাহিল শরীফের প থেকে ৩৯ সদস্যবিশিষ্ট সামরিক জোটের নেতৃত্বকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পলিসি আখ্যায়িত করার পর আমেরিকার যুদ্ধাপরাধের দায় পাকিস্তান ও সৌদি আরবের কাঁধে চাপার শঙ্কা বেড়ে গেছে। পাকিস্তান ও সৌদি আরবকে এটা স্পষ্ট করতে হবে যে, ৩৯টি রাষ্ট্রের সামরিক জোট সিরিয়ার বিরুদ্ধে কারো কর্মসূচির অংশ হবে না। সৌদি আরব মার্কিন হামলা সমর্থন করেছে, তথাপি পাকিস্তানকে মার্কিন হামলার পাশাপাশি বাশার আল আসাদের প থেকে তার বিরোধীদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের প্রকাশ্যে নিন্দা জ্ঞাপন করা উচিত। আর উচিত ওআইসির মাধ্যমে এ গৃহযুদ্ধ বন্ধের পথ বের করা। এ গৃহযুদ্ধের দীর্ঘতা পাকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকে উসকে দেবে, যার পুরোপুরি ফায়দা হাসিল করবে শুধু এবং শুধুই মুসলমানদের শত্র“রা। অনেক বছর পর আবু জাফরের কথার সাথে আজ আমাকে একমত হতে হচ্ছে। যদি মুসলমানরা তাদের সাম্প্রদায়িক মতবিরোধের ভিত্তিতে পারস্পরিক লড়াই বন্ধ না করে, তাহলে ট্রাম্পের আমেরিকা ও মোদির হিন্দুস্তান এক হয়ে আমাদেরকে একে অপরের হাতে (আল্লাহ না করুন) ধ্বংস করাবে।
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং থেকে
ভাষান্তর : ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com









ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com