ভিডিও গ্যালারি
বুধবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৭
  •   মুজাহিদ, সাকা চৌধুরীর রিভিউ আবেদন খারিজ: মৃত্যুদন্ড বহাল
  •   জর্ডানে দুই জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
সড়কে নিয়ম মানাবে কে
সমকাল থেকে ড. সৈয়দ রফিকুল আলম রুমীর লেখা
Publish Date : 2017-04-20,  Publish Time : 06:39,  View Count: 121    6 months ago

সম্প্রতি পত্রিকার রিপোর্ট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিন দেশে কোনো না কোনো স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। জনসংখ্যা ও সড়ক দৈর্ঘ্যের অনুপাতে গাড়ির সংখ্যা সবচেয়ে কম হওয়া সত্ত্বেও সারাবিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় সর্বাধিক মানুষ আহত, নিহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করছে। আবার গাড়িপ্রতি দুর্ঘটনার হারও বাংলাদেশে বিশ্বের সর্বাধিক। নানাবিধ কারণে বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া না গেলেও যেটুকু তথ্য পত্রিকায় পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় যে, প্রতি বছর গড়ে ৬ থেকে ৮ হাজার লোক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টে বাংলাদেশে বছরে ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় বলে উল্লেখ আছে।

আহত-নিহতের সংখ্যা যাই হোক প্রতিটি দুর্ঘটনাই মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক। দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি বহুমুখী এবং তা সবসময় আর্থিক হিসাবে পরিমাপ করা যায় না। তবে পৃথিবীর উন্নত-অনুন্নত সব দেশেই সড়ক দুর্ঘটনা হয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো অসতর্ক এবং অবহেলার কারণে খুব কম দেশেই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। আমাদের দুর্ঘটনাগুলোকে দৈব বলা চলে না বরং এই দুর্ঘটনাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই সৃষ্ট। যেমন সুনির্দিষ্ট উদাহরণস্বরূপ বলা চলে, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার নর্থ-সাউথ রোডে সকাল সাড়ে ৬টায় ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের মেধাবী ছাত্রী সাদিয়া হাসান তার মায়ের সঙ্গে ফিরছিলেন মেডিকেল কলেজে। এ সময় উল্টো রাস্তা দিয়ে একটি বাস তাদের বহনকারী অটোরিকশাকে মুখোমুখি চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। ২৬ মার্চ ক্যামব্রিয়ান কলেজের এক শিক্ষক তৃপ্তি শংকর তালুকদার ফুটপাত ধরে সাবধানেই হাঁটছিলেন কলেজে যাওয়ার জন্য। এ সময় রাস্তায় পাল্লা দিয়ে চলা দুটি বাসের মধ্যে একটির চালক বাস ফুটপাতে তুলে তাকে চাপা দিলে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।

আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো সবার জানা। এসব কারণের সারমর্ম একটাই তা হচ্ছে, গাড়ি চালানোর সর্বক্ষেত্রেই নিয়ম না মানা। আজ ইউরোপের দেশগুলোতে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে (২০০৮ সালে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত 'Zero deaths on Europe’s Roads' সম্মেলন থেকে)। সেখানে আমাদের দেশে প্রতিদিন ১৪-১৫ জন করে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের রিপোর্টে দেখা যায় যে, উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় আমাদের দেশে দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা ৫০ গুণ বেশি।

গাড়ি চালানোর নিয়মনীতিগুলো না মানলে দুর্ঘটনা হওয়াই স্বাভাবিক। যেমন অতিরিক্ত গতি, এই গতি রাস্তার ডিজাইন, বাঁক ও সুপার এলিভেশনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বাঁক ও সুপার এলিভেশনের ক্ষমতার চেয়ে বেশি গতিসম্পন্ন হলে ওই গাড়িটি সেন্ট্রিফিউগাল শক্তির প্রভাবে সড়কের বাইরে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার ওজনের সঙ্গে ব্রেকের একটি সম্পর্ক আছে। বাসের ছাদে ও বোঝাই ট্রাকের ওপর যাত্রী বহন করা কোনো দেশেই আইনসঙ্গত নয়। অথচ আমাদের দেশে প্রশাসনের চোখের সামনেই যেন এটা একটা নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে। গত ২৫ মার্চ পত্রিকায় প্রকাশ, ময়মনসিংহের ভালুকায় সিমেন্ট বোঝাই একটি ট্রাক নির্মাণাধীন রাস্তার গর্তে পড়ে উল্টে গেলে ১০ জনের মৃত্যু ঘটে। এর মধ্যে হতদরিদ্র রিকশাচালক আজিজুল হক তার পরিবারের আরও চারজনসহ মৃত্যুবরণ করেন। আইন লঙ্ঘন করে বোঝাই ট্রাকের ওপর না উঠলে হয়তোবা একসঙ্গে এতজনের প্রাণহানি ঘটত না।

সড়ক-মহাসড়কে যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক স্থানীয়ভাবে রূপান্তরিত ও নির্মিত নছিমন, করিমন, ভটভটি, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন ইত্যাদির সংমিশ্রণ দেখা যায়। এগুলো অপসারণের কথা বারবার বলা হলেও অপসারিত হয় না। উপরন্তু এসব গাড়ির গতি কম হওয়ায় দ্রুতগতির গাড়ি বাধাগ্রস্ত হয় এবং দুর্ঘটনার সৃষ্টি হয়। রাতের বেলায় এ ধরনের গাড়ি অত্যন্ত বিপজ্জনক। এগুলো বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থা বিআরটিএ কর্তৃক রেজিস্ট্রেশনভুক্ত নয়। ফলে মোটরযান আইনে এদের বিরুদ্ধে মামলা হয় না। হলেও তা শেষ পর্যন্ত টেকে না। গত ২৬.৩.২০১৭ তারিখ চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলায় বেপরোয়া গতিতে চলা একটি ট্রাকের চাপায় ২২ জন রাস্তা নির্মাণ শ্রমিক বহনকারী একটি ভটভটি লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলে ১৩ জন শ্রমিক নিহত এবং বাকিরা আহত হন। দুর্ঘটনা সৃষ্টির জন্য এ ধরনের অবৈধ গাড়ি ও বেপরোয়া গতি বহুলাংশে দায়ী।

আমাদের দেশে সড়ক নিজেও অনেক সময় দুর্ঘটনার কারণ গয়ে দাঁড়ায়। সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে দুর্নীতি, কারচুপি, মানসম্মত না হওয়া এবং অতিরিক্ত ভারী ট্রাক চলাচলের ফলে রাস্তা দ্রুত দেবে যায় এবং ফাটল ও গর্তের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া ত্রুটিপূর্ণ বাঁক, অপ্রশস্ত সড়ক, অধিকাংশ হাইওয়েতে ডিভাইডার না থাকা, মার্কিং ছাড়া স্পিডব্রেকার, সরু পুল ইত্যাদি অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া চলমান সড়ক সংস্কারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নিরাপদ ব্যবস্থা না রেখেই সড়ক খুঁড়াখুঁড়ি, সড়ক বেদখল ও সড়কের অবৈধ ব্যবহার যেমন- সড়কের ওপর হাটবাজার, নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা, ধান শুকানো, মিটিং-মিছিল করার কারণে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। রাস্তাঘাট যাই হোক সব দুর্ঘটনার জন্য চালকই হচ্ছেন প্রাথমিকভাবে দায়ী। কারণ ধরেই নেওয়া হয়, তিনি সবরকম ঝুঁকি এড়িয়ে গাড়িটি চালাবেন এবং তার হাতেই থাকে গাড়ির সব নিয়ন্ত্রণ। বাস্তবে চালকদের খামখেয়ালি, বেপরোয়া ভাব, অতিরিক্ত গতি, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, রোড মার্কিং, ট্রাফিক সংকেত ইত্যাদি না মানা, বিশ্রাম ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে একটানা গাড়ি চালানো এবং সর্বোপরি চালকদের অনভিজ্ঞতার কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। বিআরটিএর তথ্য অনুসারে বর্তমানে দেশে মোট ২৯ লাখ নথিভুক্ত গাড়ি আছে, যার বিপরীতে লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা ১৯ লাখ। সুতরাং বাকি ১০ লাখ গাড়ি চলছে লাইসেন্সবিহীন অনভিজ্ঞ চালকের হাতে।

বাংলাদেশের সড়ক-মহাসড়কে লাগামহীন নৈরাজ্য ও অপ্রতিরোধ্য সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সরকারকেই আন্তরিক ও বলিষ্ঠ হতে হবে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনমনীয় এবং কঠোর হতে হবে। তবে শুধু আইন করে বা শাস্তি দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা যাবে না। সেই সঙ্গে প্রয়োজন পরিবহন শ্রমিক-মালিক-যাত্রী ও সড়ক ব্যবহারকারী সবার আন্তরিক প্রচেষ্টা। মনে রাখতে হবে, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সব স্তরের জনগণের অংশগ্রহণই প্রধান সহায়ক শক্তি। দুর্ঘটনা রোধ ও সড়কের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে- ক. যানবাহন নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত বাহিনী; খ. চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স এবং গ. চালকদের সুযোগ-সুবিধা।

সড়ক-মহাসড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে ফায়ার ব্রিগেড, অ্যাম্বুলেন্স-ডাক্তার ও প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং উদ্ধার কর্মী। এই বাহিনীর হাতে থাকবে রোকার ক্রেন, আধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি, যেমন তাৎক্ষণিক গাড়ির গতি নির্ণয়ক যন্ত্র, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ পরিমাপক যন্ত্র, ওজন নির্ণয়ক স্কেল ইত্যাদি। মহাসড়কের ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার দূর দূর এই সমন্বিত বাহিনীর স্টেশন থাকবে এবং তাদের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকবে।

ভবিষ্যতে পেশাদার চালকদের লাইসেন্সপ্রাপ্তির জন্য নূ্যনতম এসএসসি পাস হতে হবে। লাইসেন্স প্রদান করা হবে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থেকে। বিআরটিএর অধীনে প্রতিটি জেলা শহরে সরকারিভাবে কমপক্ষে একটি করে ট্রেনিং প্রতিষ্ঠান খুলতে হবে। যেখানে এসএসসি পাসের পর Driving and Motor Mechanism-এর ওপর দুই বছরের ট্রেনিং কোর্স সমাপ্তির পর পরীক্ষায় পাস করলে তাদেরকে লাইসেন্স ও সার্টিফিকেট দেওয়া হবে। প্রতিটি লাইসেন্সে ১০০ পয়েন্ট থাকবে। এর মধ্যে প্রতি ২০ পয়েন্টের জন্য এক স্টার ধরে মোট ৫ স্টার সমমানের হবে। চালক আইন অমান্য করলে বা দুর্ঘটনা ঘটালে তার ২০ পয়েন্ট কাটা যাবে এবং তখন তার লাইসেন্সের মান হবে ৪ স্টার। এভাবে দ্বিতীয় দফায় অপরাধ করলে আরও ২০ পয়েন্স কাটা যাবে এবং লাইসেন্সের মান হবে ৩ স্টার। এভাবে কারও লাইসেন্সের মান ২ স্টারের নিচে নেমে গেলে তিনি আর কোনো গাড়ি চালাতে পারবেন না। বড় বাস ও ট্রাকের জন্য অভিজ্ঞতাসহ চালকের বয়স ৩০-এর ঊধর্ে্ব এবং ৪-৫ স্টার লাইসেন্স লাগবে। মাঝারি ও ছোট গাড়ির জন্য লাগবে ২-৩ স্টার মানের লাইসেন্স, চালকদের বেতন-ভাতা নির্ধারিত হবে লাইসেন্সের মান এবং সরকারি পে স্কেলের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সম্মানজনকভাবে। ৫ স্টার মানের লাইসেন্সধারী চালকের বেতন হবে সবচেয়ে বেশি।

জাতীয় মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে চালকদের জন্য বিশ্রামাগার নির্মাণ করতে হবে, যাতে করে একজন ক্লান্ত চালক বা হঠাৎ অসুস্থ হওয়া চালক ওই বিশ্রামাগারে নেমে বিশ্রাম নিতে পারেন এবং সেখানে পূর্ব থেকে বিশ্রামরত অপর কোনো চালক ওই গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাবেন। এভাবে চালক বদলের একটি ব্যবস্থা থাকবে, যা মালিক-শ্রমিক যৌথভাবে সমন্বয় করবেন। বিশ্রামাগার ও টার্মিনালগুলোতে চালকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে, যাতে করে হঠাৎ প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা পাওয়া যায়। গাড়ি চালনার ক্ষেত্রে যে কোনো সমস্যা বা দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক মহাসড়ক সমন্বিত বাহিনীকে অবগত করতে হবে, যাতে জনগণ নিজের হাতে আইন তুলে নিতে না পারে।

উপরোক্ত বিষয়গুলো প্রয়োজনীয় সংশোধন সাপেক্ষে প্রয়োগ করতে পারলে দুর্ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতি বহুলাংশে নেমে আসবে আশা করি।

পরিবহন গবেষক; প্রফেসর, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
samakal









ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com