ভিডিও গ্যালারি
রবিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১৭
  •   মুজাহিদ, সাকা চৌধুরীর রিভিউ আবেদন খারিজ: মৃত্যুদন্ড বহাল
  •   জর্ডানে দুই জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
তুরস্কের ভোটের হিসাবে ধর্ম ও অর্থনীতির প্রভাব
প্যাট্রিক কিংসলে
Publish Date : 2017-04-19,  Publish Time : 10:29,  View Count: 18    2 weeks ago

পেশায় শিক্ষক মারভে আর্সলান কিছুতেই মানবেন না প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান একজন স্বৈরশাসক। তিনি একজন গণতান্ত্রিক—জোর দিয়েই বলেন ২৮ বছর বয়সী মিসেস আর্সলান। রবিবারের গণভোটে এরদোয়ান সামান্য ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। ৫১ দশমিক ৩ বনাম ৪৮ দশমিক ৭। ব্যবধান সুস্পষ্টতই সূক্ষ্ম। এর পরও এর জোরে প্রেসিডেন্ট তাঁর কর্তৃত্বপরায়ণতা আরো বাড়িয়ে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার সুযোগ পেলেন। অবশ্য দেশটির প্রধান বিরোধী দল ভোট পুনর্গণনার দাবি জানিয়েছে। কুর্দিপন্থী দল পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (তুর্কি নামের আদ্যক্ষরে পরিচিত এইচডিপি নামে) বলেছে, ৩০ লাখ ভোটার ভোটাধিকার ছাড়াই প্রেসিডেন্টের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, তাঁদের এই ভোট জাল হিসেবে প্রমাণ করা গেলেই প্রেসিডেন্ট হেরে যাবেন।

সোমবার প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফোন পেয়েছেন; ট্রাম্প তাঁকে বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। তবে তুরস্কের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশটিতে যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, এ প্রসঙ্গে ট্রাম্প মুখ খোলেননি। ট্রাম্পের সঙ্গে এরদোয়ানের তুলনা যদি করেও তা ভুল হবে। এরদোয়ান ট্রাম্প নন। তিনি তুরস্কে ধর্মের প্রসার বৃদ্ধির সুফল পেয়েছেন মাত্র।

ইউরোপের নির্বাচন পর্যবেক্ষকরাও রবিবার অনুষ্ঠিত এই ভোট নিয়ে আপত্তি তুলে বলেছেন, এই নির্বাচন সব পক্ষের জন্য সমান সুযোগ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) নিশ্চিত করতে পারেনি। জরুরি অবস্থা জারি থাকার কারণে প্রধান বিরোধী দলগুলোর হাজার হাজার নেতাকর্মী গ্রেপ্তার রয়েছেন। শোভাযাত্রা বের করা এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারের সুযোগও ছিল সীমিত।

নির্বাচন কমিশন কোনো অনিয়ম হয়ে থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। আর ভোট পুনর্গণনার আবেদনের ভাগ্যে যাই থাকুক—এ বিষয়টি প্রমাণিত হয়ে গেছে যে তুরস্ক জাতি এখন স্পষ্টতই দুই ভাগে বিভক্ত। ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বড় নগরী বা শহরগুলোয় এরদোয়ানের সংস্কার কর্মসূচির বিরোধিতা করা হয়েছে। কিন্তু মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে, যেখানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ ধর্মকর্ম বেশি করেন এবং যাঁরা রক্ষণশীল ধাঁচের তাঁরা প্রেসিডেন্টের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

একসময় তুরস্ক ছিল আঞ্চলিক অর্থনীতির কেন্দ্র। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাদের সীমান্তের ওপারে সিরিয়ায় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে তুরস্কে বিদেশি বিনিয়োগে ধস নামে এবং এই অর্থনৈতিক ভরকেন্দ্রটি তাদের হারাতে হয়।

গত বছরের জুলাই মাসে এরদোয়ানের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট রাজনৈতিক শত্রু শিবিরের ৪৫ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করেন। চাকরিচ্যুত অথবা বরখাস্ত করা হয় এক লাখ ৩০ হাজার ব্যক্তিকে। এবার গণভোটে বিজয়ী হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে আরো বেশি মাত্রায় নিপীড়ন চালাবেন কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়।

গত সোমবার এরদোয়ান বলেছেন, এই গণভোটের রায় রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার কাজে বড় ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেছেন, তুরস্ক এই প্রথম ‘সিভিল পলিটিকস’ তথা বেসামরিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে। তাঁর মতে, তুরস্কে এর চেয়ে ভালো গণতান্ত্রিক চর্চা আগে আর হয়নি।

এরদোয়ান স্বৈরাচারী হিসেবেই অনেকের কাছে পরিচিত। কিন্তু তাঁর দেশের অর্ধেকেরও কিছু বেশি মানুষ যে প্রেসিডেন্টের পক্ষেই রায় দিয়েছে, এ তো অস্বীকার করা যাবে না।

এই রায়দাতাদেরই একজন স্কুল শিক্ষিকা আর্সলান। আর্সলান মনে করেন, প্রেসিডেন্ট তুরস্কে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার কিছু পরিধি বিস্তৃত করেছেন; বিশেষ করে ধর্মীয় স্বাধীনতা। ১০ বছর আগে আর্সলান তুরস্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেননি মাথায় স্কার্ফ পরিধান করতেন বলে। এ জন্য মূলত দায়ী এরদোয়ানের পূর্বসূরি শাসকদের প্রণীত আইন। এরদোয়ান ধীরে ধীরে আইন শিথিল করে নিয়ে আসেন। ২০০৮ সাল থেকে স্কার্ফ পরিহিত নারীরাও শিক্ষাঙ্গনে ঢোকার অনুমতি লাভ করেন। ২০১৩ সাল থেকে সরকারি চাকরিতেও এই নারীদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয়। গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে সেনাবাহিনীতেও চাকরির সুযোগ তাঁদের দেওয়া হয়েছে। বিশ শতকের বেশির ভাগ সময় এমন কিছু আইন তুরস্কে বলবৎ ছিল, যেগুলো ধার্মিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে যায়নি। সেখান থেকে ধীরে ধীরে দেশকে বের করে এনে একধরনের স্বাধীনতার জানালাই খুলে দিয়েছেন এরদোয়ান।

মিসেস আর্সলান বলেন, ‘আমি আর ওই যুগে ফিরে যেতে চাই না। এ কারণেই রবিবারের গণভোটে প্রেসিডেন্টের পক্ষে ভোট দিয়েছি। ’

অতি সম্প্রতি তুরস্কের অর্থনীতিতে মন্দাভাব পড়তে শুরু করেছে। এর আগ পর্যন্ত এরদোয়ান অর্থনৈতিক উন্নয়নেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। সুপরিকল্পিতভাবেই হোক কিংবা ভাগ্যক্রমে, তাঁর মেয়াদের প্রথম বছরগুলোয় দেশের অবকাঠামো, রাস্তাঘাট, সেতু, হাসপাতালসহ নানা খাতে উন্নয়ন হয়েছে; যা তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে নিঃসন্দেহে ভূমিকা রেখেছে।

তুরস্কের বেশির ভাগ জনগণ যখন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা আরো বৃদ্ধির পক্ষে রায় দিয়েছে, বাইরের অনেকেই বলছেন, এই গণভোট গণতান্ত্রিক ছিল না। অনেকেই বলেছেন, জাতীয়তাবাদকে লালন করার সুফলও ঘরে তুলেছেন এরদোয়ান। অতি সম্প্রতি তিনি ইউরোপের সঙ্গেও বিরোধে জড়ান এবং গণভোট পর্যবেক্ষণে ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের তুরস্কে আসায় বাদ সাধেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন মনে করছে, তুরস্ক যে পথে হাঁটছে, আখেরে তাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়াটা আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু দেশের অনেকেই এতে খুশি। তারা তুরস্কের একলা চলো নীতির পক্ষেই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করছে। ইউসুফ পারলায়ান (৬০) নামের একজন ভোটার বলছিলেন, “আমরা এরদোয়ানের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘না’-এর জবাবে। ” এমনও মনে করা হচ্ছে, তুরস্কের কুর্দি সম্প্রদায়েরও অনেকের সমর্থন প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান পেয়েছেন।



লেখক : নিউ ইয়র্ক টাইমসের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি

সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস










ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com