ভিডিও গ্যালারি
রবিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১৭
  •   মুজাহিদ, সাকা চৌধুরীর রিভিউ আবেদন খারিজ: মৃত্যুদন্ড বহাল
  •   জর্ডানে দুই জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
হাওরে বৈশাখীর নিরাপত্তা কে দেবে?
আইপোর্ট নিউজ:
Publish Date : 2017-04-19,  Publish Time : 10:29,  View Count: 13    2 weeks ago

লাগাতার রাষ্ট্রীয় অবহেলা, অন্যায় আর অনাচারের ভেতরেই জেগে থাকে হাওর। দেশকে জোগায় ধান আর মাছ, দুনিয়াকে উপহার দেয় গান। সেই হাওরের বেদনা গাথা নিয়ে সমকালে পর্যালোচনা করেছেন পাভেল পার্থ।

দেশজুড়ে হরকিসমভাবে প্রায় সবাই বাংলা বছর বিদায় দিয়েছে, স্বাগত জানিয়েছে নতুন বছর। চৈত্রসংক্রান্তি থেকে পহেলা বৈশাখ এবার গ্রাম থেকে শহরের রাস্তায় জমেছে শোভাযাত্রা। চাকমারা ফুল বিজু করেছে, মূল বিজু করেছে এবং গয্যাপয্যাও শেষ করেছে। ত্রিপুরারা বৈসুক, মারমারা সাংগ্রাই, রাখাইনরা সাংগ্রেং, ম্রোরা চানক্রান, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিরা বিষু, সাঁওতালরা নেওয়া সেরমা পালন করেছে। হয়তো কম, হয়তো মাঝারি, কোথাও হয়তো একটু ভালোই আয়োজন। কিন্তু হাওরাঞ্চলে এবার জমেনি সংক্রান্তি কি বর্ষবরণ। পালনীয় কিছু কৃত্য আচার করেছেন পরিবারের প্রবীণ নারীরা। যেন চৈত্রসংক্রান্তি বিদায় নেয়নি এবার হাওরে। চইত বিষুর টান লাগেনি ভাটির জলে। বেগুন পাতার বর্তও করেনি অনেকে। চড়কের মাগনের দল ঘুরেছে ডুবন্ত জনপদে। খুব বেশি মেলেনি চাল-ডাল। সবই করেছে হওরবাসী। হিরাল এসেছে ফাল্গুন মাসেই। বজ্রপাত থেকে বোরো মৌসুমের ধান জমিন রক্ষায় হিরালেরা মন্ত্র দিয়ে অনেক হাওর বন্ধন করেছে। নারীরা গোবর-জলে লেপে-মুছে কাটা ধান মাড়াই, ঝাড়াই ও শুকানোর জায়গা 'খলা' তৈরি করে রেখেছে। ঘরে ঘরে ধান রাখার ডোল ও মটকা শুকিয়ে রেখেছে বাড়ির বৌ-ঝিরা। কিন্তু 'পাহাইড়্যা ঢলের' এক ধাক্কায় সব তলিয়ে গেছে। ধান জমিন থেকে ধানের খলা সব। চইত পরবে বেগুন পাতার বর্ত করার একটা বেগুন গাছও পাওয়া যায়নি অনেক জায়গায়। চৈত্রসংক্রান্তিতে হাওরে তিতা খাওয়ার নিয়ম। ঘৃতিকাঞ্চন, ঠুনিমানকনি, গিমাই, দণ্ডকলসের মতো সব শাকগুল্মই পানির তলায় ডুবে আছে। হাওরাঞ্চলে ধান ঋতু মূলত একটাই। বোরো মৌসুম। চৈত্র মাসে ধান কাটা শেষ হয়, বৈশাখ থেকে জ্যৈষ্ঠজুড়ে চলে ধানের কারবার। চৈত্র থেকে জ্যৈষ্ঠ এ সময়জুড়ে হাওর এলাকা প্রধান কর্মউৎসবের নাম 'বৈশাখী'। বৈশাখীতে ঘরে তোলা ধান বেচেই বছরের খোরাক এবং নানা দেনা-পাওনা শোধ করতে হয়। কৃষিমজুরের বেতন থেকে শুরু করে রাখালের মজুরি। নৌকা খেয়াঘাটের বছরভর যাতায়াতের খরচ কি হিরালের পাওনা সব শোধ করতে হয়। এবার সবই তল হয়েছে। দেখার হাওর, শনির হাওর, মাটিয়ান হাওর, নলুয়ার হাওর, সজনার হাওর, হাইল হাওর, হাকালুকি হাওর, কাউয়াদীঘি হাওর, ঘুইঙ্গাজুড়ি হাওর, জালিয়ার হাওর, বাওরবাগ ও খরচার হাওর, পাথরচাউলি বা চেপটির হাওরের মতো দেশের শত শত হাওরের আদি বৈশিষ্ট্যের সব জমিন আজ পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে।

বাংলাদেশকে যদি ছয় ভাগ করা হয়, তার এক ভাগই হাওর জনপদ। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া_ এই সাতটি প্রশাসনিক জেলায় বিস্তৃত দেশের হাওরভূমি এক দুঃসহ মরণযন্ত্রণা পাড়ি দিচ্ছে। রাষ্ট্র বরাবরই হাওরকে এড়িয়ে চলে, হাওরের যন্ত্রণাকে আড়াল করে চলে। লাগাতার রাষ্ট্রীয় অবহেলা, অন্যায় আর অনাচারের ভেতরেই জেগে থাকে হাওর। দেশকে জোগায় ধান আর মাছ, দুনিয়াকে উপহার দেয় গান। চৈত্র-বৈশাখে অবিরত বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলের পানিতে হাওর তলিয়ে যাওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। এটি ঐতিহাসিক এবং সুরাহাহীনভাবেই ঘটে চলেছে। হাওরের টিকে থাকা সংগ্রামের রসদ ও বিজ্ঞান কেউ হাওরবাসীকে দান করেনি বা বাড়ায়নি কোনো সহযোগিতার হাত। হাওরের বিশেষ বাস্তুসংস্থানই হাওরবাসীকে এই অঞ্চলে টিকে থাকার সংগ্রামে প্রতিদিন নতুনভাবে প্রস্তুত করে তোলে। রাষ্ট্র এই প্রস্তুতির দিকে ফিরেও তাকায় না। সবকিছু ডুবে তলিয়ে গেলে সরকার কিছু উফশী ধানের সিদ্ধ চালের বস্তা নিয়ে আসে। কখনও ঘর তোলার জন্য কয়েক বান্ডিল ঢেউ টিন। এর বেশি কিছু নয়। হাওরের উন্নয়ন বলতে রাষ্ট্র এখনও বুঝে ডুবন্ত রাস্তা, ফসল রক্ষা বাঁধ আর বাণিজ্যিক মাছ চাষের জন্য বিল জলাভূমির ইজারাকে। আর এ নিয়েই বছরভর লেগে থাকে স্থানীয় থেকে জাতীয় জনপ্রতিনিধি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের ভেতর ভাগ-বাটোয়ারার দরবার, কোন্দল আর দুর্নীতি। হাওরের উজান-ভাটির শর্তকে কেউই মান্য করে না। হাওরের সুরক্ষা প্রশ্নটি কোনোভাবেই বাঁধ, ইজারা আর অবকাঠামোর সঙ্গে জড়িত নয়। সংকটের মূল জায়গাটি এখানেই। হাওরের সঙ্গে সম্পর্কহীন বা হাওরের উজান-ভাটির অঙ্ক বুঝতে না পারা উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের চাপিয়ে দেওয়া এমনতর দশাসই সব উন্নয়নচিন্তাই হাওরকে প্রতিবছর তলিয়ে দেয়। ডুবিয়ে মারে। বাঁধ দিয়ে কি কোনোভাবে একটি জলজ বাস্তুসংস্থানের সুরক্ষা হয়? শনির হাওরের জন্য বাঁধ দিলে মাটিয়ান হাওর ডুবে মরে। হাকালুকির উত্তরে বান দিলে দক্ষিণে নিদান শুরু হয়। হাওরের সুরক্ষাকে রঙবেরঙের উন্নয়নের রোদচশমা চোখে দিয়ে নয়, দেখতে হবে হাওরের চোখেই। হাওরবাসীর উজান-ভাটির অঙ্ক থেকেই।

হাওরাঞ্চলগুলো ভাটিতে অবস্থিত। উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলগুলো হলো হাওরের সাপেক্ষে উজান অঞ্চল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জ ছাড়া দেশের অন্যান্য অঞ্চলের প্রায় হাওরগুলোই উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয়, আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যের কাছাকাছি। উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি উজানে জন্ম নিয়েছে শত সহস্র পাহাড়ি ঝরনা ও ছড়া। এই পাহাড়ি জলধারাই বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলের নদ-নদীগুলোর উৎসস্থল। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জি ও বাংলাদেশের মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল দুনিয়ার দুই বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল হাওরাঞ্চলেই অবস্থিত। চৈত্র-বৈশাখের বর্ষণের ঢল উত্তর-পূর্ব ভারতের উজানের পাহাড় থেকে বাংলাদেশের ভাটির হাওরে নেমে আসে বলেই এই ঢল 'পাহাইড়্যা পানি বা পাহাড়ি ঢল' নামে পরিচিত। আর পাহাড়ি ঢলেই আজ তলিয়ে যাচ্ছে ভাটির হাওর। পাহাড়ি ঢলের ফলে তৈরি প্লাবিত এই অসনীয় অবস্থাকে হাওরের অভিধানে বলে 'আফাল'। কালবৈশাখী আর বাতাসের গতি আটকে পড়া পাহাড়ি ঢলের পানিতে 'আফরমারা' তীব্র ঢেউ তৈরি করে, যা আফাল অবস্থাকে আরও জটিল ও দুঃসহ করে তোলে। পাহাড়ি ঢল থেকে হাওরের সুরক্ষায় অবশ্যই আফাল ও আফরমারাকে বুঝতে হবে। হাওরের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ের সম্পর্কটি ঐতিহাসিক। মৈমনসিংহ গীতিকা ও সিলেটি বারোমাসির মতো হাওরের প্রাচীন দলিলগুলোতে এর সত্যতা মেলে। উজানের পাহাড় থেকে জল গড়িয়ে নামত ভাটির হাওরে। এ যেন নাইওরি আসা, জলের নাইওরি। পুরো বর্ষাকাল এই জল নাইওরি কাটিয়ে নানা নদীর প্রবাহে চলে যেত সমুদ্রে। পাহাড় থেকে সমুদ্র, জলপ্রবাহের এই দীর্ঘ পরিভ্রমণে হাওরাঞ্চল পেত বৈশাখী জলের এক বিশেষ স্পর্শ। এই স্পর্শে কোনো আঘাত, যন্ত্রণা বা তলিয়ে যাওয়ার ছল ছিল না। বরং ওই জলে জীবনের টান ছিল। রাধারমণ থেকে শাহ আবদুল করিম কেউই এই জলের টান অস্বীকার করতে পারেননি। আর তাই এখনও সেই টান জাগিয়ে রাখেন ভাটির নারীরা ধামাইল গানের নাচে, ... জলে গিয়াছিলাম সই, জলে গিয়াছিলাম সই, কালা কাজলের পাখি দেইখ্যা আইলাম অই। রাধারমণের এই ধামাইল গীতে দেখা যায়, জলে গিয়ে কালা কাজলের পাখির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আবার ফিরে আসা যায়। কিন্তু এখন যায় না। এখন কালা কাজলের পাখিসহ প্রেমিক দর্শনার্থী নিজেও দুম করেই পাহাড়ি ঢলের তলায় হারিয়ে যায়। ডুবে ভেসে যায়।

কেবল উত্তর-পূর্ব ভারতের উজান অঞ্চল নয়, ভাটির বাংলাদেশও সবগুলো হাওর ধনী ও প্রভাবশালীদের ইজারা দিয়ে হাওরকে বানিয়ে রেখেছে বাণিজ্যিক মৎস্য খামার। যে পাহাড়ি বালি হাওরের জন্য আজ অন্যতম প্রধান সমস্যা, সেই পাহাড়ি বালি-পাথর বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছে একদল মুনাফাখোর। এই জল ও বালিমহাল ইজারাদার কি দখলদাররাই হাওরের অর্থনীতি থেকে আজ রাজনীতিও নিয়ন্ত্রণ করছে। এরা মনে-প্রাণে চায় মেঘালয় পাহাড় ভেঙে হাওর ভরাট হয়ে যাক এবং বছর বছর তলিয়ে যাক। উজানের খনি ব্যবসায়ী ও ভাটির ইজারাদাররা মূলত একই নয়া উদারবাদী করপোরেট মনস্তত্ত্ব ধারণ করে। ভাটির বাংলাদেশে হাওর ইজারা নিয়ে প্রাকৃতিক জলাভূমিতে আগ্রাসী হাইব্রিড বিপজ্জনক মাছদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। হাওরের নানা জায়গায় বান দিয়ে জলতরঙ্গ আটকে দেওয়া হয়েছে। হাওরের নদী ও প্রবাহগুলোকে আটকে দেওয়া হয়েছে। মানে হাওরের উজান ও ভাটি আজ সবখানেই সব দিক থেকে বন্ধ, শৃঙ্খলিত ও আবদ্ধ।

তাহলে কি বৃষ্টি হবে না? পানির ধর্ম বদলে যাবে? পানি তো উজান থেকে ভাটিতে গড়াবেই। তাহলে উজান থেকে ভাটিতে বৃষ্টির ঢলকে গড়িয়ে যাওয়ার পথগুলো বারবার বন্ধ করে যে উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা করা হচ্ছে, তা কোনোভাবেই হাওরের সুরক্ষা দিতে পারেনি। চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। হাওরের এই উজান-ভাটির অঙ্কটি সচল রাখার দাবি কোনোভাবেই আজকের নতুন নয়, ভাসান পানির আন্দোলনেরও আগ থেকে হাওরবাসী এই দাবি করে আসছে। কিন্তু রাষ্ট্র এটি কোনোভাবেই কানে তুলছে না। রাষ্ট্র হাওরকে বহুজাতিক কোম্পানির কাছে ছেড়ে দিয়েছে। নয়া উদারবাদী মুনাফার ময়দানে জিম্মি হয়ে আছে হাওর। পাহাড়ি ঢলে হাওরের এই তলিয়ে যাওয়া বিষয়টি পুরোপুরি একটি আন্তঃরাষ্ট্রিক সংকট। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ অংশগ্রহণের ভেতর দিয়েই এক বহুপক্ষীয় জলাভূমি ব্যবস্থাপনা নীতি গ্রহণের ভেতর দিয়েই কেবল এর সুরাহা সম্ভব। তা না হলে হয়তো আবারও হাওরে বৈশাখীর প্রস্তুতি নেবে সংগ্রামী মানুষ, আবারও হয়তো চৈত্রের ঢলে তলিয়ে যাবে হাওর। হাওরের বৈশাখীর নিরাপত্তা তাহলে কে দেবে?

animistbangla@gmail.com

গবেষক, প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ











ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com