ভিডিও গ্যালারি
মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০১৭
  •   মুজাহিদ, সাকা চৌধুরীর রিভিউ আবেদন খারিজ: মৃত্যুদন্ড বহাল
  •   জর্ডানে দুই জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
কওমি মাদরাসার বুনিয়াদি ভূমিকা ও অবদান
মাওলানা লিয়াকত আলী
Publish Date : 2017-04-19,  Publish Time : 10:29,  View Count: 290    4 months ago

কওমি মাদরাসা ইসলামের নির্ভেজাল শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়। কওম বা জাতির দ্বীনি শিক্ষার চাহিদা পূরণের জন্য জনসাধারণেরই স্বতঃস্ফূর্ত আর্থিক সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হওয়ার কারণে নাম হয়েছে কওমি মাদরাসা।

ভারতবর্ষ থেকে শুরু হলেও বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের সব জায়গায় এমনকি অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতেও মুসলমানেরা এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা ও ব্যবস্থাপনার কারণে মুসলিম আমজনতার সক্রিয় তত্ত্বাবধান ও আনুকূল্যের কারণে এগুলো জনগণের একান্ত আপন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই কওমি মাদরাসা জাতির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণমূলক এবং খাঁটি দ্বীনি শিক্ষা ও শিক্ষার কেন্দ্র। মুসলিম জাতির আস্থা, আন্তরিকতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এসব প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি।

১৮৫৭ সালে সর্বভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন গড়ে ওঠে। চতুর ইংরেজরা এটাকে খাটো করে দেখানোর জন্য নাম দেয় সিপাহি বিদ্রোহ। ছলে বলে কৌশলে ও ক্ষমতার জোরে ব্রিটিশ কোম্পানি সরকার এই আন্দোলন দমন করে। মুঘল সালতানাতের শেষ ঘাঁটি দিল্লিও মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে যায়। আন্দোলনে নেতৃত্বদান ও অংশগ্রহণের দায়ে হাজার হাজার আলেমকে শহীদ করা হয়।

মাদরাসাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় এবং ওয়াকফ করা লাখেরাজ সম্পত্তিগুলো বাজেয়াপ্ত করা হয়। অর্থাৎ ইসলামি শিক্ষার পণ্ডিতদের যেমন নিশ্চিহ্ন করা হয়, তেমনি ভবিষ্যতেও যেন ইসলামি শিক্ষার ধারা চালু না থাকে, তার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু মুসলিম মনীষীরা হাল ছেড়ে দেননি।

তারা রাজত্বহারা মুসলমানদের যেন ধর্মহারা হতে না হয়, সে জন্য বিকল্প পন্থা উদ্ভাবন করেন। দিল্লি থেকে নিরাপদ দূরত্বে দেওবন্দ ও সাহারানপুরে তারা গড়ে তোলেন জনসাধারারণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানের ওপর নির্ভর করে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা ও স্থাবর সম্পত্তি ছাড়া সম্পূর্ণ তাওয়াক্কুল আলাল্লাহ বা আল্লাহর ওপর নির্ভরতাকে পুঁজি করে মুসলিম জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত দান সংগ্রহের মাধ্যমে তারা শিক্ষার এই নতুন ধারা চালু করেন। নতুন এই শিক্ষা আন্দোলন কওমি মাদরাসা হিসেবে পরিচিত লাভ করে। সরকার নয়, কওম বা জাতিই এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভিভাবক ও পৃষ্ঠপোষক।

১৮৬৬ সালে দেওবন্দ মাদরাসা ও প্রায় একই সময়ে সাহারানপুর মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পর সেখান থেকে শিক্ষাপ্রাপ্তরা উপমহাদেশের প্রত্যন্ত এলাকায় একই ধারায় ও নীতিতে মাদরাসাগুলো গড়ে তোলেন। আমাদের এ বাংলাদেশে যেসব প্রসিদ্ধ কওমি মাদরাসা চালু আছে, সেগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের হাটহাজারী দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম ১৯০১, জিরি ১৯১১, ঢাকার তাঁতিবাজার ১৯১৩, সিলেটের গাছবাড়ী ১৯০১, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জামেয়া ইউনুসিয়া ১৯১৪, গওহরডাঙ্গা ১৯৩৬, ঢাকার বড়কাটারা ১৯৩৬, চট্টগ্রামের চারিয়া ১৯৪৩, পটিয়া ১৯৩৭, কিশোরগঞ্জের জামিয়া ইমদাদিয়া ১৯৪৫ ও লালবাগ মাদরাসা ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এখন শুধু বাংলাদেশেই কয়েক হাজার ছোটবড় কওমি মাদরাসা চালু আছে।

সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠান মুসলিম উম্মাহর শিশু ও তরুণদের ইসলামের শিক্ষায় ও ভাব ধারায় গড়ে তোলার মহান খেদমত করে যাচ্ছে। সভ্য, কর্মঠ, দায়িত্ববান সুনাগরিক গড়ে তুলতে এসব সেবার কোনো জুড়ি নেই। সে কারণেই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও আনুকূল্য না থাকলেও জনসাধারণের আস্থা অটুট রয়েছে। জনগণ মনে করে ধর্মীয় জ্ঞানে গভীর, ধর্ম পালনে নিষ্ঠাবান ও আপসহীন এবং আচরণ ও লেনদেনে নির্ভেজাল ও অকৃত্রিম ব্যক্তিরা কওমি মাদরাসা থেকেই সৃষ্টি হয়। জনগণের এই সুধারণা ও বিশ^াসই কওমি মাদরাসাগুলো টিকে থাকার ও উন্নতি লাভ করার প্রধান কারণ।

স্বাধীনতা লাভের পর আলেমসমাজ রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে না জড়িয়ে জাতি গঠন ও সমাজ সংস্কারের কাজটিকে পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত দানের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও পরিচালনার মহান ব্রত গ্রহণ করেন। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যারা শিক্ষিত হয়ে বের হন, তারা হন সুনাগরিক। আপন স্রষ্টার হুকুম মেনে চলার তাগিদেই তারা সমাজ ও জাতির প্রতি কর্তব্যপরায়ণ হন। দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যনিষ্ঠার দীক্ষা তাদের মস্তিষ্ক ও মননে এমন গভীর ছাপ ফেলে যে, কওমি মাদরাসার আঙিনায় মাত্র দু-চার বছর কেটেছে এমন ব্যক্তির সততা ও সজ্জনতা হয় প্রশ্নাতীত।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সাধারণ শিক্ষা বা রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য ও পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের নৈতিক দীক্ষার দিকটি একেবারেই শূন্য বললে অত্যুক্তি হবে না। সাধারণ ও বিশেষায়িত বিশ^বিদ্যালয়গুলো থেকে স্নাতক হয়ে যারা বের হচ্ছেন এবং রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দায়িত্ব নিচ্ছেন, তাদের বিরাট অংশের মধ্যে সামাজিক দায়িত্ববোধ ও জাতীয় কর্তব্যনিষ্ঠার অভাব পরিলক্ষিত হয়।

শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, চিকিৎসাবিদ, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী হওয়ার পাশাপাশি যদি তাদের মধ্যে আমানতদারি ও ইখলাস বা দায়িত্ববোধ ও নিষ্ঠা থাকত, তাহলে আমাদের তৃতীয় বিশে^র দেশগুলো এত দিন পিছিয়ে থাকত না।

কওমি মাদরাসাগুলো জাতিকে এমন একদল সন্তান উপহার দিয়েছে, যারা আপন স্বার্থ ও অধিকারের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে অভ্যস্ত। ত্যাগ ও অল্পে তুষ্টি কওমি পড়–য়াদের অনন্য বৈশিষ্ট্য। বৈষয়িক প্রাচুর্য ও প্রতিষ্ঠার প্রতি তাদের চিরাচরিত অনীহা ও বিরাগ স্থূল দৃষ্টিতে যা-ই মনে হোক, প্রকৃতপক্ষে এ কারণেই শত প্রতিকূলতা ও বিপত্তি সত্ত্বেও কওমি ধারার মাদরাসাগুলো টিকে আছে ও থাকবে ইনশাআল্লাহ।

কওমি আলেমরা রাষ্ট্রীয় কোনো আর্থিক সহযোগিতা নেন না। এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য রাষ্ট্রকে আর্থিক দায় বহন করতে হয় না। যদি হতো, তাহলে রাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়ত। কওমি মাদরাসা পড়–য়াদের চাকরি দিতে হয় না। তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে ও স্ব-উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হতে চান। তারা
রাষ্ট্রের বরাদ্দ খাতে ভাগ বসান না। বরং জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আলো দেয়ার জন্য জনগণকেই উদ্যোগী বানায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে। স্থাপনা, অনুদান কিংবা এমপিওভুক্তির পেছনে তারা পড়ে থাকেন না। শিক্ষা ক্ষেত্রে কওমি আলেমরা নিঃস্বার্থ ও অনন্য অবদান রেখে চলেছেন। কওমি
পড়–য়া প্রচুর হাফেজে কুরআন ও আলেম এখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করছেন। দেশের অভ্যন্তরে তারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন। এভাবে দেশের অর্থনীতিতে তারা অসামান্য অবদান রাখছেন।

সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা ও বিবাদ নিরসনে কওমি আলেমদের নেপথ্য ভূমিকা খুব কম মূল্যায়ন করা হয়। বরং তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ নেতিবাচক দৃষ্টিতে বিবেচনা করে। এ জন্য হয়তো তাদের অজ্ঞতা কিংবা অসৎ উদ্দেশ্য দায়ী।

পারিবারিক কলহ, উত্তরাধিকার বণ্টনে মতভেদ, খাদ্য পানীয়ের বৈধতা নির্ণয়ে জটিলতা, কায়কারবার লেনদেনের বিবাদ ইত্যাদি নিরসনে ইসলামি শরিয়াহর নির্দেশনা জানার জন্য সাধারণ মুসলমানেরা যখন আলেমদের শরণাপন্ন হন, তখন কুরআন মাজিদ ও হাদিসে নবুবির আলোকে ও পূর্বসূরি মনীষীদের বিবেচনা ও অভিমত সামনে রেখে আলেমরা যে পরামর্শ দেন, তাতে পক্ষগুলোর দ্বন্দ্ব মিটে যায় সহজে।

দ্বীন পালনে আন্তরিকতা ও আগ্রহের কারণে মুসলিম জনসাধারণ আলেমদের কাছে আসেন। আলেমদের এই পরামর্শ ও মন্তব্যই ফতোয়া নামে আখ্যায়িত। এ জন্যই জনসাধারণ নিজেদের প্রশ্ন ও সমস্যার সহজে সমাধান পাওয়ার উদ্দেশ্যে মুফতি সাহেবদের দ্বারস্থ হন। আর নিখরচায় সেবা পাওয়ার এই অনন্য ব্যবস্থার জন্য কৃতজ্ঞ থাকেন। এভাবে সমাজের সূত্র অবিচ্ছিন্ন রাখতে ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আলেমরা অনন্য ভূমিকা পালন করেন। মুসলিম সমাজ তাই আলেমদের সাথে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কযুক্ত।

আলেমদের নিরপেক্ষতা, নিঃস্বার্থতা ও বিবেচনাবোধের ওপর জনসাধারণের অকৃত্রিম আস্থার কারণে সমাজে আলেমদের প্রভাব ও মান্যতা সাধারণ শিক্ষিতদের ঈর্ষার বিষয়। ফতোয়ার বিরুদ্ধে অপপ্রচারের মূল কারণ এটাই।

মোট কথা দেশ ও জাতি গঠনে কওমি মাদরাসার বুনিয়াদি ভূমিকা ও অবদান রয়েছে যা স্বীকার না করা অকৃতজ্ঞতার ব্যাপার। বরং এই অস্বীকৃতির পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য কাজ করে বলে মনে করার যথেষ্ট যুক্তি আছে। অতএব কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি নায্য অধিকারের স্বীকৃতি দিলেন। আমরা তার এই ঘোষণাকে স্বাগত জানাই এবং শিগগিরই তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে আশা রাখি।










ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com