ভিডিও গ্যালারি
মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০১৭
  •   মুজাহিদ, সাকা চৌধুরীর রিভিউ আবেদন খারিজ: মৃত্যুদন্ড বহাল
  •   জর্ডানে দুই জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
মহানগরে গাছ লাগানোর কিছু সমস্যা
আইপোর্ট নিউজ:
Publish Date : 2017-04-19,  Publish Time : 10:29,  View Count: 121    4 months ago

আমরা একসময় ধরেই নিয়েছিলাম, মেয়র মানে প্রায় অদৃশ্য একজন মানুষ, যিনি সোনার গাড়িতে চেপে ঘুরে বেড়ান, সাধারণ মানুষ কখনোই যাঁর নাগাল পান না, এমনকি যাঁকে কেবল কালেভদ্রেই দেখা যায়। কিন্তু আমাদের তথাকথিত এই ধারণা পাল্টে দিলেন ঢাকার দুই মেয়র। তাঁরা প্রমাণ করলেন, মেয়র মানে অদৃশ্য কিছু নয়। বাস্তব জগতেই তাঁদের বিচরণ। আমাদের দুই মেয়র নাগরিক জীবনের কল্যাণ সাধনের জন্য মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, ব্যক্তিস্বার্থ নয়, সবাইকে বৃহৎ স্বার্থের কথা ভাবতে হবে। তাই গণমাধ্যমে প্রতিদিনই তাঁদের কোনো না কোনো ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে।

ঢাকা উত্তরের মেয়র অনেক উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। সবুজ ঢাকা তৈরির পরিকল্পনা সেসবের অন্যতম। এরই অংশ হিসেবে ২০১৬ সালে উত্তরা ও গুলশান-বনানী এলাকায় কয়েক হাজার গাছের চারা লাগানো হয়েছে। প্রতিবছরই এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। বৃক্ষরোপণের এই মহৎ ও বৃহৎ কর্মযজ্ঞে যুক্ত হয়েছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের আমন্ত্রণে আমিও সম্পৃক্ত হয়েছিলাম গত বছর। বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একাধিক সভা করে ঠিক করা হয় কোথায় কোন ধরনের গাছ লাগানো হবে। উত্তরার বিভিন্ন সেক্টরের স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়েও একাধিক মতবিনিময় সভা হয়।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের স্বেচ্ছাসেবীদের নিরন্তর সহযোগিতায় শুরুটা বেশ ভালোই হয়েছে বলা যায়। শুধু গাছ লাগিয়েই শেষ হয়নি কাজ, কেন্দ্রের স্বেচ্ছাসেবীরা গাছগুলোর পরিচর্যাও অব্যাহত রেখেছেন। কাজটি সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য ধীরে ধীরে করপোরেশনভুক্ত সমগ্র এলাকার একটি নকশা তৈরি করে সে অনুযায়ী বৃক্ষরোপণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। তাহলে স্থায়িত্বের পাশাপাশি আমরা একটি নান্দনিক শহরও দেখতে পাব।

কিন্তু গাছ লাগাতে গিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা মোকাবিলা করেছি চারা সংগ্রহের ক্ষেত্রে। প্রধানত আমরা যে গাছগুলো লাগাতে চাই, সেসব চারা-কলম নার্সারিতে দুষ্প্রাপ্য। দ্বিতীয়ত, অযৌক্তিক দাম। গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে এটি একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশেই একই চিত্র। নার্সারিগুলোতে দেশি গাছের চেয়ে বিদেশি গাছের সংগ্রহ বেশি। আবার নার্সারিগুলোর বিরুদ্ধে ক্রেতাদের ভুল চারা গছিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। আপনি মাধবী চাইলে পাবেন মধু মঞ্জরি, চেরি খুঁজলে ক্রেব, পেস্তাবাদামের পরিবর্তে কনকচাঁপা, এমনকি বার্ড অব প্যারাডাইস বলে হ্যালিকোনিয়াও ধরিয়ে দিতে পারে।

আবার কোনো কোনো নার্সারিকে জাফরান বলে দই গোটার গাছও বিক্রি করতে দেখা যায়। অচিরেই এসব অসংগতি দূর করা উচিত। নার্সারি এখন আর রুগ্ণ কোনো শিল্প নয়। সরকারি জায়গা নামমাত্র মূল্যে ব্যবহার করে লাভজনক এই প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চমূল্যে গাছ বিক্রি করা কতটা যৌক্তিক, তা ভেবে দেখতে হবে। আসলে নার্সারিগুলোতে চারা উৎপাদন ও বিপণনের ক্ষেত্রে একটি সঠিক নীতিমালা থাকা জরুরি। পাশাপাশি নার্সারি-সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণও অত্যাবশ্যকীয়। ঢাকায় এখন অনেকেই বৃক্ষরোপণে আগ্রহী হয়েছেন।

সাধারণ মানুষের এই আগ্রহকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। গাছের দাম যেন সহনীয় পর্যায়ে থাকে, সে বিষয়ে সরকারের আন্তরিক নজরদারি প্রয়োজন।

গাছের চারা সহজলভ্য করার জন্য ঢাকা সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি নার্সারি প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। সম্ভব না হলে অন্তত থানা পর্যায়ে হলেও প্রাথমিকভাবে শুরু করা যেতে পারে। সর্বোপরি ঢাকায় একটি বিশেষায়িত নার্সারি গড়ে তোলা প্রয়োজন। যেখানে দেশের দুর্লভ, বিপন্ন প্রজাতির গাছপালাসহ সব ধরনের প্রয়োজনীয় গাছ কম দামে পাওয়া যাবে।

এতে সাধারণ ক্রেতারা প্রতারণা থেকেও রক্ষা পাবে। সিটি করপোরেশন উদ্যোগ নিলে আমরা তরুপল্লব থেকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছি।

উন্নত দেশগুলোতে নগর-বৃক্ষের যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য আলাদা সংস্থা থাকে। ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতেও নগর কর্তৃপক্ষের অধীনে এমন সংস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।

তারা গাছ লাগানো, পরিচর্যা, পরিসংখ্যান তৈরি, নকশা প্রণয়নসহ যাবতীয় কাজের তদারক করবে। কারণ, বৃক্ষরোপণ এখন একটি বিশেষায়িত শিল্প, যা নগরের সৌন্দর্য রক্ষা করে। পাশাপাশি নগরকে বাসযোগ্য রাখতেও সহায়তা করে। ইচ্ছেমতো যত্রতত্র যেকোনো গাছ লাগিয়ে দেওয়ার প্রাচীন ধ্যানধারণা এখন অচল।

গাছ লাগানোর পর পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষণ আবশ্যকীয়। গাছ বেঁচে থাকলেই যে দায়িত্ব শেষ, তা নয়। বড় গাছগুলোর শিকড়, কাণ্ড ও ডালপালা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। মৃত গাছ, ডালপালা ও দুর্বল কাণ্ডের গাছগুলো দ্রুততার সঙ্গে সরিয়ে ফেলা উচিত। নরম কাণ্ড ও ডালপালাবিশিষ্ট গাছ পথতরু হিসেবে অনুপযুক্ত। তাতে পথচারীদের মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। ২০১৬ সালের যে সময়ে নির্মাতা ও শিল্পী খালিদ মাহমুদ মিঠু গাছ চাপা পড়ে মারা যান, এ বছরও প্রায় কাছাকাছি সময়ে আরেকজন পথচারী গাছ চাপা পড়ে নিহত হন। এই দুই মৃত্যুর দায় কে নেবে?

ভুক্তভোগী পরিবার কার কাছে এর প্রতিকার চাইবে? কর্তৃপক্ষ যদি গাছগুলো পর্যবেক্ষণ করত, তাহলে হয়তো এমন দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো।

ঢাকাকে যদি সুন্দরতম নগরী বানাতে হয়, তাহলে সবুজায়নের পাশাপাশি ঋতুভিত্তিক পুষ্পসমারোহ গড়ে তুলতে হবে। শুধু বসন্ত-গ্রীষ্মে ঢাকায় বিক্ষিপ্তভাবে যত্সামান্য ফুল ফুটতে দেখা যায়। বছরের অন্য সময়ে বিবর্ণ-হতশ্রী হয়ে পড়ে এই শহর। কিন্তু আমরা চাই, সারা বছরই ফুলের সৌন্দর্যে সুসজ্জিত থাকুক এই শহর। শহরটি গড়ে উঠুক ছয় ঋতুর শহর হিসেবে। এটা অসম্ভব বা অবাস্তব কিছু নয়। কারণ, আমাদের প্রকৃতিজুড়ে ছয় ঋতুতে বিচিত্র রঙের ফুল ফোটে। সেগুলো সংগ্রহ করে যথাযথভাবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তাহলে শহরটি আরও বেশি নান্দনিক ও প্রকৃতিবান্ধব হয়ে উঠবে।

কিছুদিন আগে পত্রিকায় পড়েছি, ঢাকার পার্কগুলোর উন্নয়নকল্পে বিশাল কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্থাপত্যবিদ্যার সঙ্গে ব্যবহারিক উদ্ভিদবিদ্যার প্রত্যক্ষ সংযোগ স্থাপন আবশ্যকীয়। কারণ, কাজটি মোটেও একক বা একতরফা কিছু নয়। নিসর্গ নির্মাণের ক্ষেত্রে এই দুয়ের সমন্বয় আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হবে। এ ধরনের কাজে নিসর্গীদের প্রত্যক্ষ সংযোগ ঘটলে ঢাকার বৃক্ষবৈচিত্র্য বৃদ্ধি পাবে। আমরা চাই না ঢাকায় হাতিরঝিলের মতো অসামঞ্জস্যপূর্ণ বৃক্ষায়ণের পুনরাবৃত্তি ঘটুক। আশা করি, মান্যবর দুই মেয়র বিষয়গুলো ভেবে দেখবেন।

মোকারম হোসেন: প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক।










ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com