ভিডিও গ্যালারি
সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭
  •   মুজাহিদ, সাকা চৌধুরীর রিভিউ আবেদন খারিজ: মৃত্যুদন্ড বহাল
  •   জর্ডানে দুই জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
পর্যটন খাতঃ বাংলাদেশ যেখানে অনেক পিছিয়ে
আলী ইমাম মজুমদার
Publish Date : 2017-04-19,  Publish Time : 10:29,  View Count: 119    8 months ago

ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বিশ্বের প্রতি ১০টি চাকরির ১টির জোগান দিয়েছে পর্যটন খাত। আবার জিডিপিতে এ খাতের অবদান ৭ লাখ ৬০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার, যা ১০.২ শতাংশের কাছাকাছি। এর সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কোনো প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া গেল না। তবে ২০১২ সালে এ দেশের শ্রমশক্তির ১.৮ শতাংশ পর্যটন খাতে নিয়োজিত ছিল।

ডব্লিউটিটিসির প্রতিবেদনেই তথ্যটির উল্লেখ রয়েছে। আশা প্রকাশ করা হয়েছে, এটা ২০২৩ সাল নাগাদ ৪.২ শতাংশে উন্নীত হবে। আর হালে জিডিপিতে এর অবদান ২.৪ শতাংশ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্প্রতি প্রকাশিত একটি
তথ্যানুসারে বৈশ্বিক অবস্থানে ১৩৬-এর মাঝে আমরা ১২৫তম। আর দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে। ৫৫ হাজার বর্গমাইলের ছোট একটি দেশ হলেও বাংলাদেশে পর্যটন খাত যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। এ খাত সম্প্রসারণের জন্য সরকার বিভিন্ন সময়ে কিছু কার্যক্রম নিয়েছে।

তবে সাফল্য ঈপ্সিত পর্যায়ে আসেনি। গত কয়েক বছর বেসরকারি খাত যোগ দিয়েছে। কিন্তু সরকারের নীতিগত সমর্থনের অসম্পূর্ণতা, অপ্রতুল অবকাঠামোসহ বিভিন্ন কারণে বিনিয়োগ জোরদার হচ্ছে না। পশ্চাৎমুখী হানাহানির রাজনীতি এবং হালের জঙ্গিবাদ এর টুঁটি চেপে ধরেছে। আমাদের অর্থনীতিতে কৃষি, শিল্পসহ বিভিন্ন খাতের যেমন চমক সৃষ্টিকারী প্রবৃদ্ধি দেখছি, তেমনটা দেখা যাচ্ছে না পর্যটন খাতে।

অন্যদিকে আমাদের পাশেরই একটি ভূমি আবদ্ধ দেশ নেপাল। আয়তন আমাদের প্রায় সমান। ২০১১-এর গণনা অনুসারে জনসংখ্যা তিন কোটির মতো। সে দেশে পর্যটন খাতের জিডিপিতে অবদান ৫.৪ শতাংশ। শ্রমশক্তির ৪ শতাংশ নিয়োজিত রয়েছেন এ খাতে। পর্যটন নেপালের বৃহত্তর শিল্প খাত এবং বিদেশি মুদ্রা উপার্জনের প্রধান উৎস বলে বিবেচিত। কতিপয় কারণে নেপাল বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করার ক্ষমতা আমাদের চেয়ে বেশি রাখে। পৃথিবীর ১০টি সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের ৮টিই সে দেশটিতে। আর এগুলোর নয়নাভিরাম দৃশ্য ছাড়াও পর্যটনস্থানগুলো তুলনামূলকভাবে শীতল। তাই ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, জাপানসহ ধনী দেশগুলোর পর্যটক আকর্ষণ করার ক্ষমতা বেশি রাখে। তবে অস্থির রাজনীতি এখনো দেশটিকে কাবু করে রেখেছে।

রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সফল লড়াই, গণতন্ত্রের পথে নবযাত্রা এবং জাতিগত বিরোধে স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। যা-ই হোক, তার মধ্যে পর্যটনশিল্পের বিকাশে নেপাল ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। গেল কয়েক দিন আগে নেপাল থেকে বেড়িয়ে এসেছি। নাগরকোট, পোখারা আর কাঠমান্ডুতে। নাগরকোট থেকে এভারেস্ট আর পোখারা থেকে অন্নপূর্ণা পর্বতশৃঙ্গের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের অনেক পুণ্যস্থান রয়েছে এখানে। অনেক ঐতিহ্যে ভরপুর নেপাল। বছর পাঁচেক আগেও এসেছিলাম। নির্মিত হয়েছে পর্যটন-সহায়ক বিভিন্ন ধরনের ভৌত অবকাঠামোসহ অন্যান্য সুবিধা। দেখলাম ২০১৫-এর বিপর্যয়কর ভূমিকম্পের ছোবল বেশ কাটিয়ে উঠেছে এই জাতি।

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই যখন জানতে পারি ভৌত সুযোগ-সুবিধার কিছু তথ্য। হোটেল অ্যাসোসিয়েশন অব নেপালের সভাপতি দাবি করেন, সে দেশে ১ হাজার মানসম্পন্ন হোটেল রয়েছে।

সেগুলোতে আছে ২৩ হাজার কক্ষ ও ৩৫ হাজার শয্যা। রাস্তাঘাট চিকচিক করা প্রশস্ত না হলেও চলনসই। প্রাকৃতিক কারণে চড়াই-উতরাই পেরোতে হয়। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দলে দলে যাত্রী আসছে-যাচ্ছে। পর্যটনবান্ধব নেপাল প্রশাসন তাদের সেবায় সদাতৎপর। খুবই দক্ষ বলা না গেলেও অবজ্ঞার কোনো ছাপ নেই। আরও বিস্ময়ের সঙ্গে দেখি, রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করে বিজয়ী মাওবাদীরা পরাজিত রাজার পিতামহের নামে নির্মিত বিমানবন্দরটির নাম পরিবর্তন করেনি। বিভিন্ন হোটেল-রেস্টুরেন্ট যথাসাধ্য চেষ্টা নেয় অতিথিসেবার।

নেপাল অত্যন্ত আকর্ষণীয় দেশ সন্দেহ নেই। আর মানুষ আকর্ষণ খোঁজে বিভিন্নতর। সে বিবেচনায় আমাদের দেশটিও কম আকর্ষণীয় নয়। এমন সাগরবেলা, নদীনালা, দ্বীপমালাসহ বহুবিধ আকর্ষণীয় একটি দেশে আমরা তেমনভাবে পর্যটক আনতে পারছি না। তবে আশার কথা, বিদেশি পর্যটক ছাড়াও আমাদের অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ছুটিছাটায় তাদের অনেকেই ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর কিংবা নিছক কলকাতায় যান। ইউরোপ, আমেরিকায় আজকাল যাচ্ছেন বেশ কিছু। বাঙালি মধ্যবিত্তের পরিসর ও সামর্থ্য বাড়ানোর পাশাপাশি মনের জগতেও এসেছে পরিবর্তন।

এখন আর তারা ঘরমুখো থাকতে চায় না। কিন্তু সবাই বিদেশেও যেতে পারে না। সামর্থ্য একটি প্রশ্ন। ঘুরতে চায় দেশের ভেতরে। আর এটাকে আমরা সহজ করে তুলতে পারছি না। এসব ভ্রমণের স্থান সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যও আসছে না সবার নজরে।

সেন্ট মার্টিন, কক্সবাজার আর সুন্দরবন সম্পর্কে অনেকে হয়তো জানেন। জানেন বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, কান্তজিউর মন্দির আর মহাস্থানগড়, ময়নামতির শালবন বিহার সম্পর্কে। কিন্তু কজন জানেন মনপুরা, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সন্দ্বীপ, হাতিয়া, সোনাদিয়া, নিঝুম দ্বীপ সম্পর্কে?

আর জানলেই বা কী! এসব স্থানে যাওয়া এবং স্বাচ্ছন্দ্যে থাকার তো তেমন কোনো ব্যবস্থাই নেই। কজনের ভালো জানা আছে, বৃহত্তর সিলেটের হাকালুকি ও টাঙ্গুয়ার হাওর এবং বাইক্কার বিল সম্পর্কে? শীত মৌসুমে লাখ লাখ পরিযায়ী পাখির কলকাকলিসমৃদ্ধ এ ভ্রমণ স্থানগুলোতে যাওয়ার সুযোগ আছে কজনের? এসব স্থানে ভ্রমণও তথৈবচ। পর্যটনের অপার সম্ভাবনা নিয়ে আছে আমাদের পার্বত্য জেলাগুলো এবং কাপ্তাই লেক। সেখানেও তো রয়েছে নিরাপত্তাসংকট। ব্যবস্থা নেই সুলভে যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার।

যত লোক আমাদের দেশ থেকে পর্যটনের উদ্দেশ্যে ব্যাংককের পাতায়ায় যাচ্ছেন, তাঁদের কজন দেখেছেন সুন্দরবনের ভেতরের তুলনাহীন ও সীমাহীন সৌন্দর্য। কিছু বেসরকারি সংস্থা তো এ ভ্রমণের আয়োজন করছে। যদি একবার যান, যদি ঘুরে আসেন কাপ্তাই লেকসহ পার্বত্য অঞ্চলের
বেশ কিছু স্থান, তাহলে বারবার যাওয়ার নেশাতেই পেয়ে বসবে। মাইকেলের সেই অমর সৃষ্টি থেকে স্মরণে আসবে ‘হে বঙ্গ ভান্ডারে তব বিবিধ রতন’। শিক্ষা, ধর্ম, চিকিৎসা, পারিবারিক, সামাজিক যোগাযোগসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের উদ্দেশে যাওয়া দোষের নয়। বরং সামর্থ্য থাকলে
যাওয়াই সংগত। কিন্তু দেশেরগুলো বাদ যাবে কেন?

উল্লেখ করতে হয়, এই বঙ্গ ভান্ডারের বিবিধ রতন দর্শনের জন্য যাতায়াতব্যবস্থা অনির্ভরযোগ্য। থাকার মানসম্পন্ন যে কয়টি স্থাপনা আছে, সবই ব্যয়বহুল কিংবা সরকার বা বিশেষ কোনো সংস্থার নিয়ন্ত্রণে। কক্সবাজার, টেকনাফ, সেন্ট মার্টিনে ব্যক্তি উদ্যোগে কিছু স্থাপনা গড়ে উঠেছে।

তবে দেশের উত্তরাঞ্চল কিংবা সুন্দরবনসংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তার তেমন কিছুই নেই। দ্বীপগুলো বলতে গেলে খাঁ খাঁ করছে। বলা হতে পারে দ্বীপে মানুষ কেন যাবে? যাবে কোলাহলমুক্ত পরিবেশে আপনজনসহ কয়েকটি দিন কাটিয়ে আসতে। যেমনটা যায় মালদ্বীপে।

অতি সম্প্রতি ঢাকা ট্রাভেল মার্ট আয়োজিত এক সেমিনারের আলোচনা আমাদের সামনে পর্যটন বিষয়ে নতুন দিগন্ত তুলে ধরেছে। সেখানে আলোচিত হয়েছে হালাল ট্যুর এখন পর্যটন ক্ষেত্রে নতুন উপখাত হিসেবে যুক্ত হয়েছে। ২০১৫ সালে মুসলিম ভ্রমণকারীরা ১ হাজার ৩৮০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করেছেন, তাঁদের ব্যয়ক্ষমতা উত্তরোত্তর বাড়ছে এবং তাঁরা শরিয়তসম্মতভাবে জীবনযাত্রা পরিচালনা করতে আগ্রহী।

সেমিনারের আলোচকেরা উল্লেখ করেন, বিপণিবিতান, হোটেলসমূহ ও পর্যটন স্থানগুলোতে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা, হালাল খাদ্য পরিবেশন, নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক সুইমিংপুল থাকাটা এ ধরনের পর্যটনের অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। বাংলাদেশের জন্য এ ব্যবস্থা করা খুবই সহজ, কিন্তু হয়নি। অথচ
মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড এই উপখাতে প্রচুর আয় করছে। মালয়েশিয়া মুসলিম দেশ। কিন্তু নগণ্য মুসলিম অধিবাসী থাকা দেশ থাইল্যান্ডও এটা সম্ভব করেছে। সৃজনশীলতা ও লক্ষ্যে পৌঁছার দৃঢ় প্রত্যয় থাকলে সেটা সম্ভব।

পর্যটন খাতকে জোরদার করার জন্য প্রধানত সরকারকে বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে কিছু বিনিয়োগও করতে হবে। উৎসাহিত করতে হবে বেসরকারি খাতকেও। তাদের কিছুটা কম সুদে ব্যাংকঋণপ্রাপ্তির ব্যবস্থা করা দরকার। এ দেশটিকে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলতে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ কার্যকর উদ্যোগ সাফল্য আনতে বাধ্য। দেশি-বিদেশি পর্যটকে মুখরিত থাকবে আমাদের দেশের অনেক স্থান। কর্মসংস্থান ও জিডিপিতে রাখবে প্রভূত অবদান। এ প্রত্যাশা একেবারে অমূলক নয়।

আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।










ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com