ভিডিও গ্যালারি
সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭
  •   মুজাহিদ, সাকা চৌধুরীর রিভিউ আবেদন খারিজ: মৃত্যুদন্ড বহাল
  •   জর্ডানে দুই জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
অকুতোভয় এক সুরসৈনিক বব ডিলান
সাব্বির খান
Publish Date : 2017-04-17,  Publish Time : 20:01,  View Count: 212    8 months ago

২০১৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বব ডিলান প্রথা অনুযায়ী গত বছর ডিসেম্বরে স্টকহোমে আসেননি পুরস্কার গ্রহণ করতে, এমনকি পুরস্কার ঘোষণার পর নোবেল কমিটি ডিলানের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। সারা বিশ্ব স্তম্ভিত হয়েছিল ডিলানের এই আচরণে। পুরস্কারপ্রাপ্তির অনুভূতিটুকু জানাতেও বিশ্বখ্যাত রকস্টার কুণ্ঠাবোধ করেছিলেন। ফোনে বা বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে ব্যর্থ হয়ে সুইডিশ নোবেল কমিটি চুপ হয়ে গিয়েছিল। গত বছর ২৯ অক্টোবর বব ডিলান দ্য টেলিগ্রাফের সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে শুধু বলেছিলেন, ‘সাহিত্যে নোবেল বিজয়ের খবরে তিনি এতটাই বাকহীন হয়ে পড়েছেন যে কোনো ধরনের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারছেন না। ’ এ বছর এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বব ডিলান স্টকহোমে এসেছিলেন পূর্বনির্ধারিত দুটি কনসার্টে গান গাইতে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে বব ডিলানকে রাজি করিয়ে শেষমেশ নোবেল কমিটিই গিয়েছিল বব ডিলানের কনসার্টে তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দিতে।

সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণার সময় দ্য রয়াল সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সেক্রেটারি সরা দানিউস পুরস্কারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘গ্রেট আমেরিকার প্রথাগত সংগীত ঐতিহ্যকে টপকে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের এক কাব্যিক অভিব্যক্তির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে বব ডিলান সৃষ্টি করেছেন ভিন্নধারার গীতি। ’ বব ডিলান আজীবন কবিতার আদলে তাঁর কাব্যিক গান সৃষ্টি করেছেন শোনার জন্য; গুচ্ছ বইয়ে মলাটবন্দি করার জন্য নয়। তিনি তা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন বিশ্বভ্রহ্মাণ্ডে ‘কান থেকে কানে’, ঠিক প্রাচীন গ্রিক কবিদের কবিতার মতো করে; সভ্যতার অলিগলিতে!

বব ডিলানের আলাদা করে দরকার নেই গাম্ভীর্যতায় পূর্ণ অতিবিদ্বান, সাংস্কৃতিক বলয়ের অতি ব্যক্তিত্বের প্রথাগত পরিচয়ের। চিন্তা-চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় বলে ১৯৬৪ সালে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম দার্শনিক এবং অস্তিত্ববাদ দর্শনের জনক ফ্রান্সের জ্যঁ পল সার্ত্রে সাহিত্যে এবং ১৯৭৩ সালে ভিয়েতনামের রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিবিদ লি দো থা শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জয়ী হয়েও তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বিশ্বসাহিত্যবোদ্ধারা ভেবেছিলেন, বব ডিলান সম্ভব ওদের মতোই নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করবেন। তাঁদের মতে, ডিলানের একজীবনের কাজ, সাহিত্যে যেকোনো নোবেল বিজয়ীর কীর্তির চেয়েও অমর থাকবে বিশ্বমানব হৃদয়ে।

বব ডিলান অনেকবার নিজেই বলেছেন, ‘অসুবিধা খুব সামান্য—আমি তো আসলে একজন সংগীতশিল্পী আর ডান্সম্যান ছাড়া আর কিছুই নই!’ তিনি না চাইলেও নোবেল কমিটি ‘টেনেহিঁচড়ে’ সেই শিল্পীর অবয়ব থেকে বের করে এনেছিলেন একজন দার্শনিক কবিকে, যার সাহিত্যকর্ম যেকোনো সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীর চেয়েও কম নয়। লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের নোবেল পুরস্কার দেওয়ার চিরায়ত প্রথাগতকে বর্জন করে নোবেল কমিটি ডিলানের শিল্পীসত্তাকে সাদা কাগজের ওপর বিছিয়ে স্পষ্ট করার প্রয়াস পেয়েছিলেন তাঁর কবিসত্তাকে।

২৪ মে ১৯৪১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী ‘রক-কবি’ বব ডিলান অনেক বছর ধরেই সাহিত্যে নোবেল পেতে পারেন বলে বিভিন্ন মহলে কানাঘুষা থাকলেও খুব কমসংখ্যকের দৃষ্টিতেই তিনি এই পুরস্কারের জন্য ‘যোগ্য’ হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। যে কারণে পুরস্কার ঘোষণার দিন উপস্থিত সাংবাদিকরাও চমকে উঠেছিলেন। সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে একই ভাবধারা পরিলক্ষিত হয়েছিল ২০১৫ সালে, যখন বেলারুশের সাংবাদিক সভেতলানা এলেক্সিয়েভিচের সাহিত্যে সমৃদ্ধ ‘সাক্ষাত্কারসমগ্র’কে সাহিত্য বিবেচনায় নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। নোবেল কমিটির এই প্রবণতাকে সাহিত্যবোদ্ধারা ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখেছেন। অনেকেই মনে করেন, ‘ডিলান নোবেলকে উজ্জ্বল করেছেন, নোবেল ডিলানকে নয়’!

ধরেবেঁধে হোক বা স্বইচ্ছায়ই হোক, বব ডিলানের হাতে নোবেল কমিটি ১ এপ্রিল শেষমেশ ক্রেস্ট এবং মানপত্র তুলে দিতে পারলেও পুরস্কারের প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলার দিতে পারেননি। ডিলান নিজে প্রাইজ মানি প্রত্যাখ্যান করেননি, তবে বিশাল অঙ্কের এই প্রাইজ মানি পেতে হলে তাঁকে প্রথানুযায়ী পুরস্কার গ্রহণের পর ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা অথবা অনুভূতি জানিয়ে নোবেল কমিটির উদ্দেশে আনুষ্ঠানিক একটা বক্তৃতা দিতে হবে, যা অন্য নোবেল বিজয়ীরা পুরস্কার গ্রহণের দিনই দিয়ে থাকেন। অনেকে ভেবেছিলেন, পুরস্কার গ্রহণের পর ডিলান স্টকহোম কনসার্টে হয়তো এই বক্তব্য দিতে পারেন; কিন্তু নোবেল কমিটি স্পষ্ট ভাষায় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়ে দিয়েছে যে ‘কনসার্টের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়!’ কমিটি আশা করছে, বব ডিলান আগামী জুন মাসের মধ্যে রেকর্ড করে হলেও একটি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নোবেল কমিটি বরাবর পাঠাবেন। নিয়মানুযায়ী ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে পুরস্কার বিজয়ী যদি এই বক্তব্য পাঠাতে ব্যর্থ হন, তাহলে উল্লিখিত প্রাইজ মানি থেকে তিনি বঞ্চিত হবেন। দ্য রয়াল সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সেক্রেটারি সরা দানিউস বব ডিলানের উদ্দেশে কিছুটা কড়া সুরে বলেছেন যে ‘ডিলান খুব ভালোভাবেই জানেন, ১০ লাখ মার্কিন ডলার পেতে হলে তাঁকে কী করতে হবে!’ তিনি আশা প্রকাশ করছেন, জুন মাসের মধ্যেই ডিলান তাঁর রেকর্ডকৃত বক্তব্য সুইডিশ নোবেল কমিটির কাছে পাঠিয়ে পুরস্কারের প্রাইজ মানি গ্রহণ করবেন, অন্যথায় নয়।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের পক্ষে নিউ ইয়র্কে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশে’ জর্জ হ্যারিসন, রিংগো স্টার, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্যাটারসন, রবিশঙ্করের সঙ্গে বব ডিলানও অংশ নিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক সেই কনসার্টে তিনি গেয়েছিলেন ‘এ হার্ড রেইন্স আ-গনা ফল’, ‘ব্লোইং ইন দ্য উইন্ড’, ‘জাস্ট লাই আ ওম্যান’সহ আরো কয়েকটি গান। শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধই নয়, সারা বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের অধিকার নিয়ে তিনি সব সময় সোচ্চার। দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়, গণমানুষের জন্য কণ্ঠের হাতিয়ার নিয়ে তিনি সদা জাগ্রত অকুতোভয় এক সুরসৈনিক! ‘একাত্তরের বন্ধু’ বব ডিলানের নোবেল বিজয়ে বাংলাদেশ গর্বিত!



লেখক : সুইডেনপ্রবাসী সাংবাদিক










ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com