Monday, 18 November, 2019, 11:07 PM
Home জাতীয়
শেখ হাসিনাকে কেন চেয়েছি
মুনতাসীর মামুন
Published : Monday, 11 March, 2019 at 6:30 PM, Update: 11.03.2019 8:37:51 PM, Count : 2

নির্বাচন হয়ে গেছে বেশ কিছুদিন, নাকি অনেক দিন? আসলে একই শাসনকাল, বিরোধীদের অনুত্তেজিত স্বর সব মিলিয়ে মাঝে মাঝে গুলিয়ে ফেলি। তবে, প্রতিদিন মিডিয়াতে পাকিস্তানপন্থি বিএনপির নেতাদের আর্ত চিৎকার মনে করিয়ে দেয় নির্বাচন হয়েছিল এবং পাকিস্তানপন্থিরা বিপুলভাবে পরাজিত হয়েছিল। বিএনপি-জামায়াতের পাকিস্তানি রাজনীতির প্রধান প্রচারক ছিল মিডিয়া, যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল মানসিকভাবে পাকিস্তানি। এখনও অনেকে সে বীজ মন থেকে উপড়ে ফেলতে পারেনি। কয়েকটি পত্রিকা ও বৈদ্যুতায়ণ মাধ্যমে ‘বিরোধী’দের খবর প্রকাশের ছলে পাকিস্তানিদের খাঁড়া করে রাখার একটি প্রয়াস দেখা যায়। এটি আমি জানি না, অন্যদের বিস্মিত করে কিনা কিন্তু আমাকে করে।

একটি রহস্যের কূলকিনারা আমি এখনও করতে পারিনি। বাংলাদেশে একটি মতামত দীর্ঘদিন ধরে শেকড় গেঁড়ে বসেছে। যারা এর ধারক তাদের মধ্যে আছেন বুদ্ধিজীবীসহ নানা পেশার এলিট মানুষজন, মাঠ পর্যায়ে রাজনৈতিক কর্মিসহ অনেকেই। এর মধ্যে লেফটিদের একটি অংশও বর্তমান।

এদের মতামত এরকম-

১.
বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনে না এলে নির্বাচন অন্তর্ভুক্তমূলক হয় না।
২. বিএনপি বা বিএনপি-জামায়াত সংসদে না এলে সংসদ কার্যকর হয় না, বিরোধিদল বলে কিছু থাকে না।
৩. বিএনপি জামায়াত এমন কিছু করেনি যার জন্য জবাবদিহি করতে হবে। বরং বঙ্গবন্ধু বাকশাল করেছিলেন, রক্ষীবাহিনি করেছিলেন, শেখ হাসিনা বিরোধীদের দমন করেছেন।
৪. বর্তমান নির্বাচন ‘প্রতারণামূলক’।

আমার বিস্ময় এ কারণেই। প্রথমেই দেখা যাক, বিএনপি নির্বাচনে না এলে নির্বাচন অন্তর্ভূক্তিমূলক হবে না কেন? নিবন্ধনকৃত দলের সংখ্যা অনেক। তারা যদি নির্বাচনে আসে তাহলে তা কেন অর্ন্তভূক্তিমূলক হবে না? যদি না হয় তাহলে নিবন্ধনের দরকার কী? নির্বাচনের ব্যাপারে পৃথিবীর সব দেশে একটি নিয়মই কার্যকর। তা হলো, নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবে। যার খুশি নির্বাচনে দাঁড়াবে। এখানে বারবার দেখা যাচ্ছে, গত এক যুগ ধরে যে নির্বাচনী দলের সঙ্গে সংলাপ করতে হবে। বিশেষ করে বিএনপির আবদারসমূহ রাখতে হবে। না, রাখলে ‘নির্বাচন কমিশন সরকারের ধামাধরা’-এরকম বিবৃতি আসতেই থাকবে। এগুলি অ্যাবসার্ড পর্যায়ে চলে এসেছে। ভোটের ধার নষ্ট করেছে তো বিএনপির স্রষ্টা জিয়াউর রহমান। বিএনপির আমলে প্রতিটি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আমাদের কিছু এনজিও প্রধান ও কিছু বুদ্ধিজীবী আছেন যারা মনে করেন, বিএনপি জামায়াত না এলে নির্বাচন অন্তর্ভূক্তিমূলক হয় না।

সংসদে বিরোধীদল গণতন্ত্রমনা থেকে শুরু করে সবাই চায়। কিন্তু জামায়াত বিএনপি না এলে সংসদ কার্যকর হবে না কেন? এক সময় আওয়ামী লীগও তো কম সদস্য নিয়ে বিরোধী দলে ছিল। বিজেপি প্রবল পরাক্রমে ভারত শাসন করার পর, পরবর্তী নির্বাচনে সংসদে দু’জন সদস্য পাঠাতে পেরেছিল। বর্তমান নির্বাচনে তো ঐক্যফ্রন্ট প্রায় ১০ টি আসন পেয়েছে। এ ১০ জনই চিৎকার শুরু করলে সরকারি দল অতিষ্ট হয়ে যেত। কিন্তু নির্বাচন করে যে এরা সংসদে যাচ্ছেন না তাতে সুশীলরা কী কিছু বলছেন? এরা চান ৭০-১০০ জন অন্তত বিএনপি-জামায়াত সদস্য থাকা উচিত ছিল। সংসদে বিএনপি বা ড. কামাল হোসেনের পার্টি না গেলে কার কী আসে যায়?

আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গ এলে বারবার বাকশালের কথা বলা হয়। তিনটি রাজনৈতিক দল তাদের অস্তিত্ব বিলোপ করে একদল করেছে তাদের নিজ ইচ্ছায়। এ ছাড়া অন্য কোনও বড় দল তখন ছিল না। এখনতো বহুদলীয় গণতন্ত্র আছে তারপরও তো বলা হচ্ছে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই। বাকশাল তো কার্যকরই হয়নি যে ভালো-খারাপ বুঝবো। শুধু মওদুদ আহমেদের বই পড়ে দেখছি, বাকশাল হওয়ার পর দেশের আইন শৃঙ্খলা থেকে খাদ্য পরিস্থিতি উন্নয়নের দিকে যাচ্ছিল। অচল গণতন্ত্র থেকে তো কিছুই পাওয়া যায় না। এখন বুঝি মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরের মানুষজন কেনো মাহাথির মোহম্মদ ও লিকুয়ান ইউ-কে মেনে নিয়েছিলেন। কারণ, দেশজুড়ে শৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন। তারা গণতন্ত্র নিয়ে মাথা ঘামাননি তা নয়। কিন্তু, যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন তাদের হচ্ছিল এর বিনিময়ে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র তারা মেনে নিয়েছিলেন। যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমি এর বিরুদ্ধে। কিন্তু ইচ্ছাতো সাধারণ মানুষের। তারা এরকম চাইলে আমাদের বলার কী আছে?

বর্তমান নির্বাচন নিয়ে যা যা বলার সব বলা হয়েছে। এ নির্বাচন অবাধ নিরপেক্ষ সুষ্ঠু হয়নি এটি শতকরা ৩০ ভাগ মানুষ মনে করে যারা জামায়াত-বিএনপির সমর্থক। না আওয়ামী লীগ সমর্থক বা দেশ নিয়ে নিয়মিত চর্চা করেণ না, এমন অনেকেও বলেছেন, বিএনপি বা ড. কামাল হোসেনকে ৩০/৪০ আসন দিলে কী হতো? এটি যদি যুক্তি হয়, তা’হলে, সোজা কথা দাঁড়ায় সরকারই নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করছে। অর্থাৎ, এ সরকার থাকুক তবে, বিএনপিও ৩০/৪০ জন নিয়ে থাকুক কারণ, তারা মনে করেন, আওয়ামী লীগই ‘ফেয়ার ভোট’ হলে চলত। এটি সামরিক শাসক জিয়া ও এরশাদের ফরমুলা। ওই ধারণাবন্দি থেকে আমরা অনেকে বেরুতে পারি নি, আসলে, ড. কামাল হোসেন বিএনপি-জামায়াতসহ অন্যান্য দলের নেতৃত্ব নেয়ায় সবার ধারণা হয়েছিল একটি বিপ্লব হবে।

তবে, নির্বাচন সর্বাংশে সুষ্ঠু হয়েছে এমন স্পষ্ট উচ্চারণ করব না। এ দেশে কখনও নির্বাচন ১০০ ভাগ নিখুঁত হয় না ইউরোপের মতো। ইউরোপে নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমাদের মডেল। অনেকে ১৯৭০, ১৯৭৩-এর নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। মোটামুটি নির্বাচন হলেই আমরা সন্তুষ্ট। কিন্তু কয়েকটি বিষয় তারা মাথায় নেন নি।

১. সংখ্যালঘু ভোটারের সংখ্যা বৃদ্ধি। একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি প্রায় ৮০টি সভা করেছে যেখানে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা / তাদের প্রতি হুমকি বেশি। এবং সরকার ও নির্বাচন কমিশন দৃঢ় ছিল সংখ্যালঘুদের ওপর কোনো হামলা হতে দেবে না। সংখ্যলঘুরা নিরাপদে ভোট দিয়েছেন।

২.
গত এক যুগে নতুন ভোটার হয়েছে প্রায় দু’কোটি। বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনীর প্রচেষ্টায় আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অধীনস্ত সকল কলেজে ১০০ নাম্বারের স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় নামে একটি কোর্স বাধ্যতামূলক করেছে। প্রায় ৫০ লাখ ছাত্র গত ৫ বছরে তা পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে খুব বেশি না জানলেও জামায়াত পাকিস্তানিরা কী করেছে তা তারা জানে। আমি গ্রামে গিয়ে দেখেছি, তরুণ ভোটাররা সব ‘নৌকা’ ‘নৌকা’ করছে। এ ছাড়া, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লেখালেখি গত এক দশকে তরুণদের প্রভাবিত করেছে। বিএনপি, জামায়াতকে ত্যাগ করেনি, এটি তারা মানতে পারে নি। এ ছাড়া বিএনপি কোনও ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাতে পারেনি। নাকি সুরে প্রতিদিন রিজভীর নেতিবাচক কথাবার্তা তরুণ ও প্রবীনদের বিরূপ করেছে। এছাড়া, সমাজের সর্বস্তরেরর বিভিন্ন পেশার মানুষ নৌকার পক্ষে ওকালতি করেছেন। যখন কোন ফিল্ম স্টার বা গায়িকা কারো পক্ষে বলেন তখন তা একেবারে সাধারণ ভোটারদের মোহিত করে। আওয়ামী লীগের পক্ষে সাংস্কৃতিক জগতের সবাই নেমে পড়েছিলেন। এ বিষয়টি বিএনপি অনুধাবন করেনি।

৩. বিএনপির মনোনয়ন এতো কেনাবেচা হয়েছে যে, যাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে এবং যিনি পায়নি তার মধ্যে বিরাট দ্বন্দ্ব ছিল। আমাদের এলাকায়, যিনি আগে প্রার্থী ছিলেন বিএনপির, তিনি তার সমর্থকদের বলে দিয়েছিলেন যেন তারা নতুন প্রার্থীর পক্ষে না নামে। এবং তারা নামেনি। সেখানে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কী করার থাকে?

৪. তাছাড়া দৃশ্যমান অর্থনৈতিক অগ্রগতি মানুষকে নিজের স্বার্থ বুঝতে শিখিয়েছে। এখন অনেকে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো যদি নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র চায় তাতে অবাক হবো না।

৫. নির্বাচনের শুরু থেকেই বিএনপি অভিযোগ করেছে, ভালো ভাবে নামেনি। হ্যা, অনেক ক্ষেত্রে তারা বাধার সম্মুখীন হয়েছে, যেরকম জিয়া বা এরশাদ আমলেও আওয়ামী লীগ নানা বাধার সম্মুখীন হয়েছে। ১/১১-এর আগেও। কিন্তু মার খেয়ে তারা মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছে। বিএনপি তা করেনি। বিএনপি একাংশ খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে যেতে চায়নি। তারা মাঠে নামেনি। মনোনীতদের অনেকে পার্টির হাইকমান্ডের মুখ চেয়ে প্রার্থী হয়েছেন। কিন্তু মাঠের আবস্থা দেখে তাদের মনে হয়েছে তারা জিততে পারবেন না। সুতরাং তারা নমো নমো করেছেন। টাকা খরচ করে মাঠে নামতে চাননি।

৬.
ব্যবসায়ীরা হাসিনা আমলে লাভবান হয়েছেন। তারাও জোটবদ্ধ হয়ে শেখ হাসিনাকে সমর্থন করেছেন। শুধু ব্যবসায়ীরা কেন, সব পেশার মানুষই হাসিনা আমলে লাভবান হয়েছেন। তারা বিএনপি-কে ভোট দিয়ে পরিবর্তন চান নি।

ব্যালটে সিল মারার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশে এমন কোনও নির্বাচন হয়নি যেখানে ব্যালটে সিল মারা হয়নি। এটি সমর্থনযোগ্য নয়, তা সত্ত্বেও গত পঞ্চাশ বছরে যে এলাকায় যে শক্তিশালী সে এলাকায় তার পক্ষে কিছু সিল মারা হয়। জিয়াউর রহমানের পক্ষে উৎসাহীরা সিল মেরে এমন অবস্থা করেছিল যে, জিয়াউর রহমান কখনও আর গণভোটের কথা বলেন নি।

আমাদের এলাকার কথা ধরা যাক, নৌকার প্রার্থী পেয়েছেন ১ লাখ ৯৭ হাজার ভোট। ৭ হাজার পেয়েছেন ধানের শীষ। ধরে নেয়া হলো ৯০ হাজার সিল মারা হয়েছে। তারপরও তো এক লাখের ব্যবধান থাকে। প্রায় প্রত্যেক এলাকায় ভোটের দৃশ্য ছিল এরকম একটা ব্যবধান। আর একটি এলাকায় কারো পক্ষে কি ৮০/৯০ হাজার সিল মারা সম্ভব?

আমাদের একটি অংশের কাছে বিএনপির শাসনকাল মানেই লুঠ, দুর্নীতি, খুন, বিশৃঙ্খলা, ২০০১ থেকে ২০১৬-২০১৭ পর্যন্ত সে ইতিহাসের বদল হয় নি। তারা বিএনপি শাসনের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে চায় নি।

এ বিষয়গুলি অ্যাপোলজিস্টয়া আমলে আনতে চান না।

আমাদের জেনারেশনের অনেকে অন্তত শেষ বারের মতো হলেও শেখ হাসিনাকে চেয়েছেন। আমাদের কাছে বিষয়টি ছিল অন্য রকম। আমাদের পক্ষে এরকম দুর্বৃত্ত সন্ত্রাসী পাকিস্তানি দলকে সমর্থন করা সম্ভব ছিল না। বিএনপির গত প্রায় চার দশকের ইতিহাস হচ্ছে দুর্নীতি সন্ত্রাস জুলুমের ইতিহাস। বাংলাদেশের মূল স্পিরিটের বিরোধী একটি ইতিহাস। পাকিস্তানিকরণের ইতিহাস। খুঁটিনাটি উদাহরণ দিতে গেলে কয়েক পাতা খরচ হবে। আমি শুধু কয়েকটি উদাহরণ দেব।

১. জাতির জনকের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়া ও তার শাসনামলের অনেকে জড়িত।
২. জাতির জনকের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত বিএনপি কর্তৃক তাদের পুরস্কৃত করা।
৩. পরাজিত ও খুনি আলবদর, রাজাকার ও জামায়াতসহ স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসন করা অর্থাৎ পাকিস্তানি সহযোগীদের পুনর্বাসন করা যাতে সম্মিলিতভাবে পাকিস্তানিকরণ করা যায়।
৪. সংবিধানের মূল নীতি বাদ দেয়া।
৫. ‘হা’ ‘না’ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকরণ শুরু করা।
৬. সামরিক বাহিনীকে অবৈধভাবে ক্ষমতায় আনা।
৭. খালেদা জিয়ার সময় থেকে পাকিস্তানপন্থি জামায়াতের সঙ্গে জোট ও তাদের কর্তৃত্ব মেনে নেয়া।
৮. জামায়াতের মতো খুনি পরাজিত শক্তিকে ক্ষমতায় আনা যা পৃথিবীর ইতিহাস একমাত্র ঘটনা।
৯. ইতিহাস শুধু নয় ইতিহাসের দলিলপত্র বিকৃত করা।
১০. সরকারিভাবে শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে খুনের প্রচেষ্টা।
১১. অবৈধ অস্ত্র পাচার।
১২. মৌল জঙ্গিবাদ সরকারিভাবে বিকশিত করা।
১৩. মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহিদ অস্বীকার করা।
১৪. মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের বিরোধিতা করা।
১৫. এ বিচার শুরু হলে, পাকিস্তানি সংসদ যখন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব করে তার প্রতিবাদ না কর।
১৬. ২০০১ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত অব্যাহত সন্ত্রাস, লুট ও ধর্ষণ। ২০১২ সাল থেকে ২০১৪ পর্যন্ত মানুষ, স্কুল, গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া। সাধারণ মানুষ থেকে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর সদস্যদের পর্যন্ত হত্যা করা।
১৭. খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার দুর্নীতি ও হত্যার দায়ে দণ্ডিত।
১৮. সবচেয়ে অভব্য কর্মটি হচ্ছে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে মিথ্যাচার এবং ১৫ অগাস্ট জাতীয় শোক দিবসে খালেদা জিয়ার জন্মদিনের পার্টি ও ঘটা করে কেক কাটা, কোনও সভ্য মহিলা এধরনের কাণ্ড করেছে রাজনীতিতে এটি এখন পর্যন্ত শোনা যায়নি।

মানুষ তাই বিশ্বাস করেছে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে এসবই করবে এবং জামায়াতের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের সব অর্জন শুধু বিসর্জনই নয়, পাকিস্তানের সঙ্গে ফেডারেশনও করতে পারে। কে আর দেশে অস্থিতিশীলতা চায়? নিজের ভবিষ্যত বিসর্জন দিয়ে কি কেউ অনুন্নয়ন চায় বা বিদ্যুতের বদলে হ্যারিকেন চায়?

প্রবীণ সাংবাদিক জনাব আমানুল্লাহ। তিনি ছিলেন বি ডি হাবিবুল্লাহর পুত্র। মহিউদ্দিন আহমদ তার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন বিএনপির রাজনীতি নিয়ে। উল্লেখ্য, আমানুল্লাহ কখনও সক্রিয়ভাবে কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। যেমন, এখন আছেন অধিকাংশ সাংবাদিকরা। আমানুল্লাহ বলেন- খালেদার শাসনকালে তারেক, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী মেজর জেনারেল আনোয়ারুল কবিরকে ডেকে পাঠালেন যেটি তিনি পারেন না। তবু তালুকদার গেলেন, দেখলেন, রুমে একটি চেয়ার নেই। তিনি বললেন, “আপনি আমাকে ডেকেছেন আলাপ করার জন্য, চেয়ার নেই, আমি বসব কোথায়”, জেনারেল তালুকদার চলে এলেন এবং পদত্যাগ করলেন।

আমানুল্লাহ নির্বাচনের আগে মহিউদ্দিন-কে বলেন, “এই ছেলেকে যদি খালেদা জিয়া ক্ষমতায় বসাতে চান, এ দেশের জন্য অমঙ্গল হবে। খালেদা জিয়ারে ভোট দেওয়ার এখন অর্থ হবে এই বাজে ছেলেটাকে ভোট দেওয়া, হুইচ বেঙ্গলি ক্যান নট অ্যাফোর্ড। শেখ হাসিনা ভালো করছেন কী খারাপ করছেন, সেটা অন্যকথা। কিন্তু আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেণ, আপনি কী ওই পসিবিলিটা একসেপ্ট করবেন? আমি বলবো, লেট হাসিনা কনটিনিউ উইন হার মিসরুল অর ব্যাডরুল। কারণ, ওই ছেলে যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে খুব খারাপ সিচুয়েশন হবে। ইউ উইল লিভ লং এনাফ টু সি দ্যাট। তবে, আমি তাদের ক্ষমতায় আমার সম্ভাবনা দেখি না, কী করব? পপুলার ভোট উইল নট বি অন হার সাইড। আপনাকে আমি সহ্য করতে পারি। কিন্তু আপনার পর যে খারাপ লোকটা আসবে, এইটা বরদাশত করতে পারি না। এরকম একটা সিচুয়েশনে আছে দেশবাসী। আমিতো সাধারণ লোকের সঙ্গেও কথা বলি। আমি নিজেও চিন্তা করি। এটা একটা আনফরচুনেট সিচুয়েশন।

আরেকটা কথা। অপজিশন পার্টি হিসেবে যে রেসপনসিবিলিটি থাকে, টু প্রটেক্ট দ্য পিপল ফ্রম দ্য র‌্যাথ অব দ্য রুলিং ক্লিক, সেইটা পালন করেনি বিএনপি। এখনো করছে না। দে হ্যাভ লেফট দ্য পিপল অ্যাই দ্য মার্সি অব আওয়ামী লীগ।”
[মহিউদ্দিন আহমদ, ইতিহাসের যাত্রী, ঢাকা, ২০১৯]

অন্যান্য দেশে এরকম দু’একটি ঘটনা ঘটালেই [পাকিস্তান ছাড়া] রাজনীতির ইতি হতো। এখানে হয় না। এ দেশের আরেকটি বৈশিষ্ট্য- এ অঞ্চলে জন্ম গ্রহণ করলেই এ দেশের নাগরিক হওয়া যায়। বিজ্ঞ বিচারকরা এধরনের একটি রায় দিয়েছিলেন মানবতাবিরোধী গোলাম আযমের ক্ষেত্রে। আমার একবার সুযোগ হয়েছিল এ রায় প্রদানকারি অপরাধী একজন বিচারপতি হাবিবুর রহমান শেলীর সঙ্গে আলাপের যিনি শুধু সজ্জনই ছিলেন না, ছিলেন পণ্ডিতও। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এ রায় আপনি কীভাবে দিলেন?, ‘আইনে আছে, যিনি এদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন তিনি এ দেশের নাগরিক হবেন’, বললেন তিনি। আমি বললাম, ১৯৭১ সালে আপনি বাংলাদেশে ছিলেন না? দেখেননি কী হয়েছে? এখন কী রায় দেবেন ১৯৭১ সাল অবৈধ? আইনের একটা দর্শন থাকবে না? দর্শন না থাকলে সে আইন মানব কল্যাণের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়? তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, এটিতো ভাবিনি। বললাম, আপনি ‘বিজ্ঞ’, আপনি ভাববেন না তো কী আমরা ভাবব?

হয়ত আমার প্রশ্নে রুঢ়তা ছিল? কিন্তু তা কী মিথ্যা ছিল? অন্য দেশের নাগরিক হতে হলে, দেশের সংবিধান, পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত মান্যের শপথ নিতে হয়। এখন তো বলা হচ্ছে, বিদেশি কেউ নাগরিক হলে তাকে ওই দেশের ইতিহাস ও ভাষা জানতে হবে। জন্ম থেকেই নাগরিকত্বের সঙ্গে দায়ের সম্পর্কটি না থাকার কারণেই এ দেশে পাকিস্তানিরা রাজনীতি করতে পেরেছে, তাদের লুপ্ত দর্শন পুনরুজ্জীবিত শুধু নয় বিকশিত করতে পেরেছে। ভাবতে অবাক লাগে যে, গত দু’ দশক আমরা ও মিডিয়া যৌথভাবে এদের বুদ্ধিজীবী হিসেবে প্রমোট করেছি, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পদে তাদের অভিষিক্ত করে হর্ষ অনুভব করেছি। মুজিব আমলে এদের অনেককে মস্কো পাঠানো হয়েছিল বিনে খরচায় উচ্চ শিক্ষিত করার জন্য।

বাংলাদেশের এভাবে সেনাবাহিনী [যাদের অধিকাংশ ছিলেন কাকুল প্রশিক্ষিত] ও অপরাজনীতির ধারক রাজনীতিবিদরা [যাদের একটা বড় অংশ ছিলেন লেফটি]। একটি শক্তিশালী সম্পন্ন এলিট শ্রেণি তৈরি করেছিল। এরা বিএনপি-জামায়াত বা পাকিস্তানি দর্শনের অভিজ্ঞান আমাদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এ বলে যে- এটি রাজনীতি। যেমন, জামায়ত বলেছে, ১৯৭১ সালে যে খুন খারাবি করেছে তা রাজনীতি। এ ‘সুধীজন’ [যাদের অসাধুজনও বলতে পারেন] বা সমর্থকরা কী মনে করে এখনও বিএনপি-কে মুক্তিযোদ্ধার দল, দুর্নীতিহীন ও সুশৃঙ্খল বাংলাদেশি দল বলেন? এবং হা হুতাশ করেন বিএনপি’র প্রতি অবিচার করা হচ্ছে বলে? যেখানে এদের রাজনীতি করতে দেয়া উচিত না সেখানে তাদের এখনও জিয়ার কবর জেয়ারত ও প্রকাশ্য রাজনীতি করতে দেয়া হচ্ছে তাই তো আশ্চর্য !

জোর করে বিএনপি-জামায়াত বা তাদের রাজনীতির পুনর্প্রবর্তন করা কঠিন হবে। তারা সেটি মেনে নিয়েছে দেখেই সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। এই বাতাবরণে ‘বিরোধী দলের’ প্রতীকটা বজায় রাখছে। কিন্তু, এখন নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতায় যাওয়া যাবে না। তো বিএনপি যদি এখন লেফটিদের মতো ক্ষমতা না চায় ভাল কথা। এনজিও হিসেবে তারা রেজিস্ট্রেশন নিয়ে কাজ করতে পারে।

শেখ হাসিনার সময় উন্নয়নের চালচিত্র দেখে না যতোটা, তারচেয়ে বেশি পাকিস্তানিকরণ রোধে তার প্রচেষ্টার জন্য আমাদের একটি বড় অংশ তাকে ভোট দিয়েছি বা সমর্থন করেছি। শেখ হাসিনা ব্যতীত আওয়ামী লীগ এ সুবিধাটি পেত কিনা জানি না। এ কারণেই আমরা অনেকে তাঁকে চেয়েছি। এ ক্ষেত্রে তার সাফল্য বা আমলকে নেইনি। তার শাসনামলের অনেক সমালোচনাও গ্রাহ্য করেনি। আমরা ঘর পোড়া গরু। আমাদের মনে হয়েছে, তিনি ক্ষমতায় না এলে শুধু পাকিস্তানিকরণই নয়, প্রগতিশীল, আওয়ামী লীগ বা তাদের অনেক সমর্থক-কে হিজরত করতে হবে।

অনেকে বলবেন, আমরা যে ভুল করেছি তা অচিরেই প্রমাণিত হবে। অতিরিক্ত সাফল্য তাকে কর্তৃত্ববাদী করে তুলতে পারে। হ্যাঁ, পারে কিন্তু তা যদি এ ধরনের অপরাজনীতি রোধ করতে পারি তাও হয়ত সহ্য করা যেতে পারে। তবে, বিপদ অন্যখানে। এখন সবাই আওয়ামী লীগের সমর্থক। আওয়ামী লীগের নেতারা তাতে বেশ আত্মতৃপ্ত। কিন্তু আমরা জানি, আমলাতন্ত্রে একটা বড় অংশ এখনও বিএনপি সমর্থক এবং তাদের একটি অংশ আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে, প্রমোশনে অগ্রণী। এক ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। এমপি-দের কয়েকজন যে আওয়ামী লীগ সমর্থক ছিলেন না তাও সবার জানা। ব্যবসায়ীদের একটা অংশ যাদের কেউ সামাজিক সম্মান দেয় না, ভয় করে, তারা সরকারের সমর্থক। শিক্ষার উন্নয়নে যে ঢাকঢোল উচ্চনিনাদে বেজেছিল এবং আমরা যারা তার সমালোচনা করায় মন্ত্রণালয় ও শেখ হাসিনার চক্ষুশীল ছিলাম, এখন বেঠিক তা প্রমাণিত হচ্ছে না। শিক্ষা সংস্কৃতির জিডিপি বৃদ্ধির চেয়ে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নে ঝোঁক অন্তিমে সুফলতো বয়ে আনবে না বরং অপরাজনীতির পরিবর্ধন হবে। মানসিক জগতে মুক্তিযুদ্ধ পক্ষের সমর্থকরা আধিপত্য বিস্তার করতে না পারা এ সরকারের একটি ব্যর্থতা।

অনেকে বলছেন, এককেন্দ্রিকতা, পার্টির অসহনশীলতা, নিরাপত্তা বাহিনী সমূহের আগ্রাসী ভূমিকার কারণে আমরা শিগগিরই গাড্ডায় পড়ব। ব্যবসায়ীদের সুদ মওকুবসহ অন্যান্য সুবিধা মানুষকে ক্রমেই ক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে। এইতো অরুন্ধতী রায় নিয়ে একটি ঘটনা হলো। অতিউৎসাহী, মাথামোটা লোক ছাড়া এ ধরনের কাজের কেউ নির্দেশ দেয় না। এই অতি উৎসাহী লোকজনকে নিবৃত না করলে বা উচ্চ পর্যায়ে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি অটুট থাকলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। আসলে বিষয়টা অরুন্ধতী রায় নয়, শহীদুল আলম। সরাসরি বিএনপি-জামায়াতের প্রতিনিধিত্ব যদি না করে, পাকিস্তানি ব্রিফ যদি ধারণ না করে- তাদের বাধা দেয়া অনুচিত। আওয়ামী লীগ বিরোধী, সরকার বিরোধী সমালোচনা কাম্য। আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিল তখন তারা কি এই ধারণা পোষণ করেনি? এ সব হতে থাকলে বললেন একজন, আপনাকে লিখতে হবে শেখ হাসিনাকে চেয়ে কেন ভুল করেছি। হ্যাঁ, সে পরিস্থিতি হলে ভুল স্বীকার করে নেব। কিন্তু, এতোদিনে যদি আরো গুরুত্ব হারায় বিএনপি-জামায়াত রাজনীতি ও তাদের এলিটবর্গ সেটিই আমাদের লাভ।

আওয়ামী লীগ বিরোধী দল থাকুক কিন্তু পাকিস্তানের ব্রিফধারীদের রাজনীতি বিলুপ্ত করতে হবে। এই বিএনপি-জামায়াত থাকার কারণে বাংলাদেশ পরিচিত পেয়েছে পৃথিবীর একমাত্র দেশ হিসেবে যেখানে স্বাধীনতা বিরোধী ও স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি রাজনীতি করে এবং ক্ষমতায় যায়। বিএনপি-জামায়াত দেশকে বিভক্তও করেছে। দেশে স্থিতিশীলতা একমাত্র বিরাজ করতে পারে এ ধরনের রাজনীতি বিলুপ্ত হলে।







« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]