Saturday, 17 August, 2019, 8:55 PM
Home বিবিধ
দেশ যদি মা হয় তার সেবাই দেশপ্রেম
সৈয়দ আবুল মকসুদ
Published : Wednesday, 31 May, 2017 at 3:17 PM, Count : 0

আজ সমকালের যুগপূর্তির দিন। এ উপলক্ষে সমকাল পরিবারের সবাইকে শুভেচ্ছা। এখন আজকের লেখার বিষয়ে যাই।

যে কোনো সমাজের মতো বাঙালি সমাজও আলেম-ওলামাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখে। শুধু মুসলমানরা নয়, অন্য ধর্মের মানুষও তাদের সমীহ করে। একসময় দেখেছি বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সমাধানে মানুষ তাদের শরণাপন্ন হতো। তাদের থেকে নিরপেক্ষ মতামত পাওয়া যেত। তখন ধর্মীয় রাজনীতি নিয়ে আলেম-ওলামারা বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত ছিলেন না। একজন নাগরিক হিসেবে বিশেষ কোনো দলের প্রতি বা কোনো নেতার প্রতি তাদের সমর্থন ছিল। কিন্তু তারা দলীয় রাজনীতিতে খুব কমই জড়াতেন। এখন তারা অনেকেই গড়ে নিয়েছেন এক একটি রাজনৈতিক সংগঠন। রাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যাপারে এখন তারা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এবং তা করেন বিপ্লবী রাজনৈতিক নেতাদের ভাষায়।

সুপ্রিম কোর্ট চত্বরের ভাস্কর্য স্থানান্তর নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্কের মধ্যে বাংলাদেশ জমিয়তুল ওলামার চেয়ারম্যান মৌলভী ফরিদউদ্দীন মাসউদ প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পদত্যাগ দাবি করেছেন। তিনি তার বিবৃতিতে বলেন, 'ভাস্কর্য বনাম মূর্তি নিয়ে তার আচরণে জাতি বিভক্ত হয়ে পড়েছে। তিনি বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন বলে অনুমেয়। এতে জাতি হতাশ। কাজেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে তিনি পদত্যাগ করে জাতিকে মুক্তি দেবেন বলে আশা করি।'

বাংলাদেশে স্কুল-কলেজ ও দাতব্য হাসপাতাল করার জন্য টাকার অভাব; কিন্তু রাজনৈতিক সংগঠন গড়ার জন্য দেদার অর্থ পাওয়া যায় বিভিন্ন দিক থেকে। মৌলভী মাসউদ সাহেবের সংগঠনের নীতি-আদর্শ সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। তবে ধারণা করি, অত্যন্ত দেশপ্রেমমূলক সংগঠন। বাংলাদেশে আজ দেশপ্রেমিক সংগঠনের অন্ত নেই। মাননীয় প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ না করা পর্যন্ত জাতির মুক্তি নেই। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তার আচরণে জাতি বিভক্ত হয়ে পড়েছে। মাসউদ সাহেবের ভাষায় 'জাতি হতাশ'। তিনি পদত্যাগ করলেই জাতির ঐক্য সুদৃঢ় হবে এবং জাতি হবে হতাশামুক্ত।

বাকস্বাধীনতা আমাদের সাংবিধানিক অধিকার। যে কোনো নাগরিকের মতপ্রকাশে কোনো বাধা নেই। আর যারা দেশের সুখ, শান্তি ও ঐক্য প্রত্যাশায় বিনিদ্র রাতযাপন করেন, তারা যে কোনো রূঢ় মতামত দিতে যে দ্বিধা করবেন না, তাতে সন্দেহ নেই। সরকার সমর্থক বিভিন্ন সংগঠনের নেতা ও বুদ্ধিজীবীরা মূর্তিটি সরানোর সমালোচনা করেছেন। কিন্তু তারা কেউ প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ দাবি করেননি। তা করলেন পরম প্রগতিশীল ইসলামী নেতা।

সুপ্রিম কোর্ট ও প্রধান বিচারপতি একটি প্রতিষ্ঠান। নানা সংকটের মধ্যেও মানুষের শেষ ভরসার স্থল সুপ্রিম কোর্ট ও প্রধান বিচারপতি। তার পদত্যাগ দাবি করা খুব ছোট ব্যাপার নয়। দেশে প্রতিদিন অন্যায়-অবিচার হচ্ছে। অন্তহীন সমস্যা। জনবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রচুর। সবই সরকার করে না, কায়েমি স্বার্থবাদী মহল করে থাকে। সেসব ব্যাপারে মৌলভী সাহেবের কোনো তৎপরতা চোখে পড়ে না। যদি বলা হয় যে, মূর্তি-ভাস্কর্য তার খুবই প্রিয় কিন্তু মূর্তি তো এর আগেও অপসারিত হয়েছে। বিমানবন্দরের সামনে থেকে যখন মূর্তি অপসারণ করা হলো, তখন বিশেষ কাউকে পাওয়া গেল না প্রতিবাদ করতে। প্রয়াত অজয় রায়, প্রফেসর খান সারওয়ার মুর্শিদ, বাম নেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য এবং আমি প্রথম বৃষ্টির মধ্যে যে প্রতিবাদ সমাবেশ করি, সেখানে যদি দেশপ্রেমিক ধর্মীয় নেতাদের এবং তাদের কর্মীদের পাওয়া যেত, তাহলে আজ আর মূর্তি নিয়ে কথা বলার সাহস পেতেন না কেউ।

বাংলাদেশ হেফাজতিদের হুকুমমতো চলবে না। এ দেশ এবং এই বাংলার সমাজ সমন্বিত সংস্কৃতির সমাজ। এখানে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতির বিশ্বাস ও সংস্কৃতি মিলে এক অভিন্ন স্র্রোতের সৃষ্টি করেছে। বাঙালির যে ইসলাম তা সহিষ্ণুতার ইসলাম। সেখানে যদি কোনো গোত্র কায়েমি স্বার্থের বশবর্তী হয়ে নানা অছিলায় ঝামেলা বাধাতে চায়, এ দেশের সাধারণ মানুষ তা বরদাশত করবে না। অনেকে আশঙ্কা করছেন যে, এই মূর্তি অপসারণে হেফাজত বা ওই জাতীয় সংগঠনগুলো শক্তিশালী হয়েছে; কিন্তু আমার মনে হয় তা হয়নি। সরকারের সঙ্গে আঁতাত করার ফলে জনগণের কাছে তাদের আপসকামী, সুবিধাবাদী ও দালালি চরিত্রের প্রকাশ ঘটেছে।

মধ্যযুগপন্থি অপশক্তিকে প্রতিহত করতে যা দরকার তা হলো, অসাম্প্রদায়িক উদার মানুষের ঐক্য। বিশেষ করে সে ক্ষেত্রে উদার ইসলামী চিন্তাবিদদের ভূমিকা খুব বড়। ইসলামের যে একটি সাম্যের দিক রয়েছে, ভ্রাতৃত্বের শক্তি রয়েছে_ সে বিষয়টি তারাই পারেন জনগণের মধ্যে প্রচার করতে। হেফাজতি গোঁড়ামি ও ধর্মান্ধতা ইসলাম নয়। ইসলাম ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজের কথা বলে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও ছিল তাই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে ইসলামী মূল্যবোধের কোনো সংঘর্ষ ছিল না। বৈষম্যহীন সমাজ ইসলামও চায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও তাই। সে চেতনা হলো নারী-পুরুষে বৈষম্য থাকবে না, হিন্দু-মুসলমানে বৈষম্য থাকবে না, সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ থাকবে না এবং মানবিক মর্যাদা সমুন্নত থাকবে। এই জিনিসগুলো আমরা এখনও অর্জন করতে পারিনি। সে জন্যই সমাজ থেকে অসন্তোষ ও অস্থিরতা দূর হয়নি।

ছোট বিষয় নিয়ে আজ আমরা বড় বেশি শ্রম ও সময়ের অপচয় করছি। আদর্শ সমাজ নির্মাণে যা যা অবশ্য করণীয় সেদিকে দৃষ্টি কম। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে আজ আমাদের নারী অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে। অথচ এখনই নারীর নিরাপত্তা সবচেয়ে বিপন্ন। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু একা সরকারের কাজ নয়। সামাজিক ও ধর্মীয় নেতাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া নারীর প্রতি যৌন নিপীড়ন ও সহিংসতা কখনও সম্ভব নয় এবং তা না করা গেলে আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি স্তব্ধ হয়ে যাবে। লোক দেখানো ও ভাবের প্রগতিশীলতা দিয়ে দেশের উন্নতি করা যায় না_ নিজের বৈষয়িক উন্নতি অর্জন করা যায়।

আজ জাতির সবচেয় বড় সমস্যা বিভ্রান্তি ও কপটতা। বাইরে নুরানি ভাব, ভেতরে কলুষতা। স্বার্থান্বেষী ইসলামী পলিটিক্স আছে, ইসলামী দর্শনের চর্চা নেই। আবুল হাশিম রাজনীতিবিদও ছিলেন, ইসলামী চিন্তাবিদও ছিলেন। তিনি ইসলামিক একাডেমির পরিচালক ছিলেন বহুদিন। দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন; কিন্তু চিন্তাশক্তি ছিল আমৃত্যু প্রখর। প্রতি রোববার একাডেমিতে জাতীয় জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে সেমিনার হতো। এখনকার দায়সারা গোছের সেমিনারের মতো নয়। পুরো পাকিস্তানের বিশিষ্ট পণ্ডিতদের প্রবন্ধ উপস্থাপনের জন্য আমন্ত্রণ করে আনতেন। সে রকম বহু সেমিনারে আহমদ ছফা এবং আমি উপস্থিত থাকতাম। তাছাড়া অন্য সময়ও তার কথা শোনার জন্য ইসলামিক একাডেমিতে যেতাম। দেখতাম তার ঘরে তিনি আলোচনা করছেন প্রফেসর আবদুস সালাম (পরে নোবেল বিজয়ী), প্রফেসর গোবিন্দচন্দ্র দেব, প্রফেসর আবু মহামেদ হাবিবুল্লাহ, প্রফেসর অজিত কুমার গুহ প্রমুখের সঙ্গে। দূরে বসে আমরা শ্রোতা। আজ কোথায় সেই বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার পরিবেশ। আবুল হাশিমের মতো গ্রন্থকার কোথায়?

আজ বাংলাদেশ ভরে গেছে নানা রকম জামায়াত, হেফাজত, তরিকত, খেলাফত, জমিয়ত, হরকাত, মুজাহিদীন প্রভৃতিতে। তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ বেকার। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার প্রতি তাদের আস্থা নেই। বাম প্রগতিশীলরা বিলুপ্ত। বাম নামে যারা পরিচিত তাদের কোনো কোনো অংশ সব সময়ই সরকারের লেজুড়বৃত্তিতে নিয়োজিত। তরুণদের ভবিষ্যৎ না থাকায় ইসলামী মৌলবাদী গ্রুপগুলো তাদের কিছু হাত খরচ দিয়ে নিজেদের দিকে টানে। একদিকে পেটি বুর্জোয়ার নষ্ট রাজনীতি, চাঁদাবাজি, মাস্তানি; অন্যদিকে ইসলামী মৌলবাদ। তাদেরও একটি অংশ জিহাদি দীক্ষায় সন্ত্রাসবাদে জড়িয়ে পড়েছে। সত্যিকারের ইসলামী দর্শনের চর্চা থাকলে মৌলবাদী সন্ত্রাসবাদ জায়গা করে নিত না।

প্রগতিশীল বলে যারা নিজেদের দাবি করেন তাদের অনেকেরই হিসাবে গোলমাল আছে। ইসলাম ও মুসলমান শব্দ দুটিতেই তাদের এলার্জি। তারা বিজাতীয় সংস্কৃতি ও আচারের মধ্যে আধুনিকতার সন্ধান পান। তারা মুহাম্মদ কুদরাত-এ-খুদা, জসীম উদ্দীন, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল ফজল, আব্বাসউদ্দীন আহমদ, আবুল মনসুর আহমদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, মুহম্মদ এনামুল হক প্রমুখের জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নেননি। আমাদের আধুনিকতাবাদীরা বাঙালি সংস্কৃতির জন্য এদিক-ওদিকে অন্ধের মতো হাতড়ান। তারাও বিভ্রান্ত এবং তারা বুঝতে চেষ্টা করেন না যে, জনগণের কোনো আস্থা নেই তাদের প্রতি। প্রগতিশীলতার ক্ষেত্রে যে দীনতা তা মৌলবাদী অপতৎপরতার চেয়ে কম ক্ষতিকর নয়।

বহু রকমের বিভেদ ও বিভাজন সত্ত্বেও বাংলাদেশি সমাজ এখনও অনেক দেশের তুলনায় শান্তিপূর্ণ। এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশের জন্য প্রশাসনের কৃতিত্ব সামান্য। হাজার বছরের সহিষ্ণু বাঙালি সংস্কৃতিই বাঙালি ও অন্যান্য জাতিসত্তার মানুষকে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করতে শিখিয়েছে। সেই সংস্কৃতির ঐতিহ্যটিই এখন কোনো কোনো গোত্র নষ্ট করার চক্রান্ত করছে। তারা কখনোই সফল হবে না; কিন্তু পরিবেশটাকে কলুষিত করছে। সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হবেই। তারাই প্রতিহত করবে ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির অপতৎপরতা_ ঘরে বসে বিবৃতি দিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল আস্ফালন রোধ করা যায় না।

বাংলাদেশ এখন একটি চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে। নানা রকম পথ থেকে একটি সঠিক পথ তাকে বেছে নিতে হবে। পথ বেছে নেওয়ার দায়িত্ব নেতার। সঠিক নেতৃত্বই সঠিক পথের দিশা দিতে পারে। তবে চিরকালই মধ্যপথ নিরাপদ পথ। কয়েকদিন আগে নির্বাচিত নতুন ফরাসি প্রেসিডেন্ট সে রকম ইঙ্গিতই দিয়েছেন বিজয়ী ঘোষিত হওয়ার পরপর। নবনির্বাচিত দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টও একই রকম সমঝোতার ভাষায় কথা বলেছেন। অতি প্রতিক্রিয়াশীলতা এবং অতি প্রগতিশীলতা মানুষ পছন্দ করে না এবং তাতে কল্যাণও নেই।

আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত বিশাল যুবসমাজ জাতির রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। সেটা তাদের দোষ নয়। সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যাপারে উৎসাহ হারিয়েছে তারা উপযুক্ত নেতৃত্ব না দেখতে পেয়ে। প্রতিদিন টেলিভিশনের পর্দায় তারা যাদের দেখে এবং যাদের বক্তৃতা শোনে, বুদ্ধিমান তরুণরা জানে তারা যোগ্যও নন, সৎও নন। তারা এক ধরনের রাজনৈতিক ভাঁড়। তথাকথিত রাজনীতি তাদের দ্বিতীয় ব্যবসা_ প্রকাশ্য ও গোপন অন্য ব্যবসা তো আছেই। এখন যুবসমাজের চেতনার মান যথেষ্ট উঁচু। তারা মানুষের চোখ-মুখ দেখে বুঝতে পারে কে আসল আর কে নকল, কে সাধু আর কে ধড়িবাজ।

সৎ ও মেধাবী যুবসমাজ রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যাপারে উৎসাহ হারিয়ে শেষ পর্যন্ত জীবিকার জন্য চাকরি-বাকরির সন্ধানেই ব্যস্ত। অন্যদিকে যুবসমাজের একটি অংশ নষ্ট রাজনীতি দ্বারা প্রলুব্ধ হয়ে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলদারিত্ব প্রভৃতি অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত হয়ে ভাগ্য গড়ে নিচ্ছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ছত্রছায়ায়। তার ফলে সমাজ অনাচারে সয়লাব হয়ে গেছে এবং ভালো ও শুভবুদ্ধিসম্পন্নরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।

যেসব প্রতিষ্ঠান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে, সেই প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সঠিক ও সাবলীলভাবে কাজ করছে না। সে জন্য দোষটা পুরোপুরি সরকারকে দেওয়া যাবে না। আমাদের সমাজে উঁচু আসনে বসা মানুষের মধ্যেও স্তাবকতার প্রবণতা খুব বেশি। নিজের আসনের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নন। তারা যে প্রজাতন্ত্রের সেবক সে কথাটি তারা ভুলে যান নিয়োগ পাওয়ার পরই। তারা নিজেদের পরিণত করেন তাদের নিয়োগদাতার ভৃত্যে। জনগণের কাছে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে রাজনৈতিক নেতাদের মতো গরম বক্তৃতা দিয়ে বেড়ান। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানরা অনেকেই সজ্জন; কিন্তু কোনো প্রধান বা সদস্য গত কয়েক দশকে সৎ সাহসের পরিচয় দিয়েছেন তেমনটি দেখা যায়নি। আপদে-বিপদে জনগণের পাশে না থেকে তারা বক্তৃতা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন। তার ফলে সরকারের বাইরেও যে সামাজিক শক্তি তা দুর্বল থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছে। মিডিয়ার কারণেও বক্তৃতাবাজরা আরও উৎসাহিত হচ্ছেন। পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল দেখে মনে হয়, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা অফিসে বসে কাজ করার সময় খুব সামান্যই পান। অবশ্যই গোলটেবিল ও আলোচনা সভায়ও তারা যাবেন, দু'চার মাসে একবার বা দু'বার_ প্রতিদিন সকালে-বিকেলে নয়।

স্বাধীনতার আগে দেখেছি, দুটি প্রধান দল আওয়ামী লীগ এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) নেতারা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অব্যাহত যোগাযোগ রাখতেন। দেশ ও সমাজের সমস্যা নিয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আলোচনা করতেন এবং মতামত নিতেন। আজ প্রধান দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে কেউ আগ বাড়িয়ে কথা বলতে গেলেও তারা আগ্রহ দেখান না। তাদের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করার জন্য তারা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনা কয়েক শিক্ষক ও কিছু বেসামরিক-সামরিক অবসরপ্রাপ্তকে মৌখিকভাবে নিয়োগ দিয়েছেন। প্রমোশনের জন্য তারা কাগজে স্তুতিমূলক লেখালেখি করেন এবং সূর্যাস্তের পর সেজেগুজে টকশোতে গিয়ে বাণী বিতরণ করেন নিজ নিজ দল ও নেতার পক্ষে। তার ফলেও সমাজসেবা ও রাজনীতি আর জনগণের মধ্যে নেই, বাক্সের মধ্যে ঢুকে পড়েছে।

জাতির জীবনে এ রকম একেকটি সময় আসে। একদিন জাতি সেখান থেকে বেরিয়েও আসে। বাঙালি জাতির জীবনেও সে রকমটি ঘটেছে। পলাশীর যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময় দালাল আর মুৎসুদ্দিতে ভরে গিয়েছিল বাংলাদেশ। সাধারণ মানুষও হারিয়ে ফেলেছিল তাদের বিবেক-বিবেচনা, এমনকি মনুষ্যত্ব। এমনকি আত্মবিশ্বাস পর্যন্ত সেই অবস্থার মধ্যেই ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ বা প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা ঘটে। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রভৃতি জীবনের সব ক্ষেত্রে বড় বড় মানুষের আবির্ভাব ঘটে। একটি অধঃপতিত পরাধীন দেশেই জন্মগ্রহণ করেন লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলামের মতো মনীষী। সুতরাং হতাশ হওয়ার কারণ নেই। যিনি সমাজের যে অবস্থানেই থাকুন না কেন, খুব খারাপ অবস্থার মধ্যেও দেশের জন্য সাধ্যমতো কিছু করা কর্তব্য। দেশ যদি মা হয়, প্রতিটি নাগরিকই তার সন্তান, সেই মায়ের সেবা করার নামই দেশপ্রেম।

বিশিষ্ট লেখক ও বুদ্ধিজীবী 





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]