Tuesday, 19 November, 2019, 6:43 AM
Home জাতীয়
কৃষি উত্পাদনে যন্ত্রের ব্যবহার
ড. আতিউর রহমান লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Sunday, 21 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 21.05.2017 4:29:24 PM, Count : 2
গত১৬ এপ্রিল পিকেএসএফ মিলনায়তনে ‘গ্রামীণ যান্ত্রিকীকরণ’ নামের একটি বইয়ের মোড়ক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলাম এমিরেটাস প্রফেসর ড. আব্দুস সাত্তার মণ্ডলের অনুরোধে। তিনি ঐ বইয়ের প্রধান লেখক। আর বাড়তি আকর্ষণ ছিল অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর উপস্থিতি। বিশেষ অতিথি হিসেবে এই অনুষ্ঠানে কিছু কথাও বলেছিলাম। প্রসঙ্গত বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নে ও উদ্ভাবনে কৃষিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর অসামান্য সমর্থন ও দূরদৃষ্টির প্রশংসা করেছিলাম। আর স্মরণ করেছিলাম আমার একসময়ের সহকর্মী ড. মাহাবুবের কৃষির উন্নয়নে অসামান্য অবদানের কথা।

থাক সেসব কথা। এবার বইয়ের আলোচনায় আসি। গ্রামীণ যান্ত্রিকীকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ফলে বাংলাদেশ ও এশিয়ার দেশগুলোর গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষির অবদান নানা প্রক্রিয়ায় বেড়েছে। ফসলের উত্পাদন, বিশেষ করে ধান ও ভুট্টার উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উচ্চ ফলনশীল প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষি-কর্মীদের উপদেশ ও পরামর্শের সুফল অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। বাংলাদেশে এ বিষয়গুলো আরো বেশি স্পষ্ট। বিশেষ করে, বাংলাদেশে আজো গ্রামীণ কর্মসংস্থানের অর্ধেকেরও বেশি জোগান দেয় কৃষি ও কৃষি-সম্পর্কিত অকৃষিখাত। খাদ্যঘাটতি দূর করার পাশাপাশি কাজের সুযোগ সৃষ্টির এই বিষয়টিই কৃষিকে আমাদের জাতীয় অর্থনীতি ও  সমাজে এতটা গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। আমাদের দারিদ্র্যের হার যে এত দ্রুত কমছে তার মূলেও এই কৃষি। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, সার্বিকভাবে এক শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাড়লে দারিদ্র্যের হার কমে ০.১১ শতাংশ। আর কৃষি প্রবৃদ্ধি এক শতাংশ বাড়লে দারিদ্র্যের হার কমে ০.৩৯ শতাংশ। এই তথ্যই বলে দেয় কেন আমরা কৃষি উন্নয়নে, বিশেষ করে খুদে ও মাঝারি কৃষকের উন্নয়নে, এতটা মনোযোগী থেকেছি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের বড় বৈশিষ্ট্যই হলো কৃষি ও কৃষকের আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের মাধ্যমে দ্রুত হারে দারিদ্র্য নিরসন। আর এক্ষেত্রে কৃষি উত্পাদনে যন্ত্রের ব্যবহার বড় ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি, কৃষির বহুমুখীকরণ, কৃষি গবেষণায় পর্যাপ্ত নীতি ও বাজেটীয় সমর্থন এবং সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ এই সাফল্য অর্জনে আমাদের সহযোগিতা করেছে। পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকেও কৃষকদের সহজে হিসাব খুলে দেওয়া, তাদের জন্য কৃষিঋণ সহজলভ্য করে দেওয়া, বর্গাচাষিদেরও ঋণের সুযোগ করে দেওয়া, মূল্য সংযোজনধর্মী কৃষিতে অর্থ জোগানো, বায়োগ্যাস প্লান্ট ও সোলার সেচ ব্যবস্থার জন্য ঋণ দেওয়া, ব্যক্তিখাতকে উত্সাহী করাসহ নানামুখী উদ্যোগের সুফল আমরা কৃষি ক্ষেত্রে পেতে শুরু করেছি। আশা করছি, কৃষিতে প্রয়োজনীয় ভর্তুকিসহ নানামুখী পুনঃঅর্থায়নের (যেমন ৪ শতাংশ হারে মসলা ঋণ, ৫% হারে গবাদিপশুর জন্য ঋণ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণে কমসুদে ঋণ ইত্যাদি) সুযোগ যেন বরাবরই অব্যাহত থাকে।

বাংলাদেশের কৃষির যান্ত্রিকীকরণ আলোচনায় শুধু কতিপয় ফসলের উন্নততর যান্ত্রিক হস্তক্ষেপের আওতায় উন্নতির জন্য করা হয়নি। সার্বিকভাবে গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণের চেষ্টা করা হয়েছে। সবজি, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, মত্স্য চাষে যান্ত্রিকীকরণ এবং এসবের উন্নয়নে উপকরণ হিসেবে ভুট্টার মতো ফসলের ব্যবহার পুরো গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্রকে অনেক বেশি গতিশীল ও উদ্যমী করতে সাহায্য করেছে। সেই দিক থেকে বিচার করলে বাংলাদেশের সুবজ বিপ্লব ছিল অনেকটাই ‘ব্রড-বেজড’ যা অন্তর্ভুক্তিমূলক। খুদে ও মাঝারি কৃষকেরাই ছিলেন এর কেন্দ্রবিন্দুতে। পাঞ্জাবের সবুজ বিপ্লব ছিল এর পুরো বিপরীত। বড়  ও ধনীকৃষকদের কেন্দ্রে রেখে পাঞ্জাবি সবুজ বিপ্লব ভর্তুকি দেওয়া জ্বালানি তেল ব্যবহারকারী বড় যন্ত্রের যান্ত্রিকীকরণের ফলে বাংলাদেশের মতো খুদে ও মাঝারি কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নে ততটা ভূমিকা রাখতে পারেনি। শুরুতে বিএডিসির নেতৃত্বে যান্ত্রিকীকরণ হলেও পরবর্তী সময়ে নীতিমালা বাজারনির্ভর উদারীকরণের দিকে এগিয়েছে বাংলাদেশ। সে কারণে বিএডিসির গভীর নলকূপের মেকানিক, খুদে ব্যবসায়ী, রেমিটেন্সের সুবিধাভোগী খুদে ও মাঝারি কৃষক বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রাপ্ত অগভীর নলকূপ ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি কিনতে সক্ষম হয়। তাছাড়া, তারা দল বেঁধেও এসব যন্ত্রপাতির মালিকানা ভাগাভাগি করে নিতে সক্ষম হয়।

কৃষির উদ্বৃত্ত ও বাইরে থেকে পাঠানো রেমিটেন্সের অর্থ মিলেই গ্রামীণ যান্ত্রিকীকরণ খুদে ও মাঝারি উদ্যোগের (এসএমই) প্রসারে বড়ো ভূমিকা পালন করেছে। ধান ভাঙার কল, লেদমেশিন, মুদির দোকান, রেস্তোরাঁ, মেশিন রিপেয়ারিং কারখানা, ঘর নির্মাণ, কাঠের কল নির্মাণ, হাঁস-মুরগির খামার, গবাদিপশুর খামারসহ অসংখ্য উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে গ্রামীণ যান্ত্রিকীকরণের প্রসার ছিল অভাবনীয় পর্যায়ের। তা ছাড়া সময়োপযোগী আমদানী নীতির উদারীকরণের ফলে চীন থেকে আসা ছোট আকারের যন্ত্রপাতি গ্রামীণ কৃষি ও শিল্পের বিকাশে বড়ো ভূমিকা রেখেছে। এসব যন্ত্র শুধু যে উদ্দেশ্যে আমদানি করা হয়েছিল সে উদ্দেশ্যেই সীমিত থাকেনি। যেমন অগভীর নলকূপের ইঞ্জিন চালনা, ধান মাড়াই এবং পরিবহন যন্ত্র (‘ভটভটি’) হিসেবেও ব্যবহূত হচ্ছে। এর ফলে গ্রামীণ যাতায়াতে গতি এসেছে। নদী ও সড়কপথে পণ্য লেনদেনেও গতি যুক্ত হয়েছে। যার সুফল পুরো গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণের ক্ষেত্রেও পরিলক্ষিত হচ্ছে।

এছাড়াও গ্রামীণ অবকাঠামো (রাস্তাঘাট, সেতু) নির্মাণে সরকারের মনোযোগ গ্রামীণ যান্ত্রিকীকরণে নয়া গতি ও মাত্রা দিয়েছে এবং গ্রামবাংলায় সংযোগের (‘কানেকটিভিটি’) গভীরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। হালে গ্রামে ডিজিটাল কানেকটিভিটিও বেড়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাবও কৃষি উন্নয়নের ওপর পড়েছে। সরকারও কৃষি যন্ত্রপাতি কিনতে কৃষকদের ভর্তুকি দিয়ে সহায়তা করছে। এসবের প্রভাব উদ্ভাবনীমূলক উদ্যমী উদ্যোক্তাদের ওপরও পড়েছে। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মত্স্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানসহ নানা প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে নতুন নতুন টেকসই কৃষি (বৃহত্ অর্থে) যন্ত্রপাতি তৈরির এক নবজাগরণ গ্রামবাংলায় লক্ষ করা যাচ্ছে। বীজ বপন, ধান কাটা, হাইব্রিড সবজি ও মাছের চাষ, গাভীর সংকরায়ন, হাঁস-মুরগির দেশোপযোগী বাচ্চা উত্পাদনসহ কতো ধরনের যান্ত্রিকীকরণই আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি। রুফ টপ গার্ডেনিংসহ সবজি বাগান উদ্ভাবনেও নতুনত্ব লক্ষ করার মতো। বাউকূল, উন্নত জাতের পেয়ারা, খেজুর চাষসহ কত কিছুই না ঘটছে।

এই বাস্তবতায় আমাদের আগামী দিনে কৃষির যান্ত্রিকীকরণে ও গ্রামীণ উন্নয়নে টেকসই কৌশল গ্রহণের স্বার্থেই যথোপযুক্ত গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। আনন্দের কথা, উদ্ভাবন ও গবেষণার প্রশ্নে আমাদের কৃষিমন্ত্রীর উত্সাহের কোনো কমতি নেই। তিনি কৃষি ও সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের নানাভাবে উত্সাহিত করছেন নতুন নতুন বীজ, ফসল ও যন্ত্রের উদ্ভাবনের জন্য। বিশেষ করে, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য যে ধরনের ‘আর এন্ড ডি’র’ প্রয়োজন সে দিকে কড়া নজর রেখেছেন। পাটের ‘জেনম উদ্ভাবন’ থেকে শুরু করে বিজ্ঞানীদের সবরকমের উত্সাহ ও উদ্দীপনা দিতে তিনি এবং আমাদের প্রধানমন্ত্রী কখনো কার্পণ্য করেননি। এজন্যে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যতালিকার পরিবর্তন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করা, গবেষকদের জন্য বয়স শিথিলকরণ এবং তাদের প্রয়োজনীয় অর্থ জোগানে তাঁরা উভয়েই গভীর আন্তরিকতা দেখিয়ে চলেছেন।

দেশের ভেতরে শুধু নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের কৃষির জন্যে গবেষণা ও উদ্ভাবনে সহযোগিতা দেবার পাশাপাশি তাঁরা নীতি সমর্থনের কথা বলে যাচ্ছেন। এমন নীতি আনুকূল্যের মাঝেই আমাদের প্রত্যাশা অফসলী কৃষির (সবজি, ফল, মাছ, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মধুর চাষ) উন্নয়নেও আমাদের সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোক্তারা তত্পর থাকবেন। খুদে কৃষকদের জন্যেও যাতে যথোপযুক্ত যন্ত্রপাতি তৈরি করা হয় সেজন্য ব্যক্তিখাতের উদ্যোক্তাদের (যন্ত্র তৈরিকারী) সামাজিক দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে হবে।

আমাদের রাজস্ব ও প্রযুক্তি সহায়তা এমনভাবে দিতে হবে যাতে করে পুষ্টির মান বৃদ্ধি করে নয়া জাতের ভুট্টা উত্পাদনে আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীরা সক্ষম হতে পারেন। সোলার জ্বালানি ব্যবহার বাড়িয়ে কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নকে পরিবেশবান্ধব করার জন্য যেসব বাজেটারি সমর্থনের প্রয়োজন হবে তা দিতে যেন সরকার কার্পণ্য না করেন। গ্রামের সাধারণ মানুষও একেকজন মেঠো বিজ্ঞানী। অনানুষ্ঠানিকভাবে তারা কতো বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। কেমন করে নলকূপের ইঞ্জিন দিয়ে নৌযান ও সড়কযান নির্মাণে তারা তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। এদের কারণেই আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি এমন চাঙ্গা হতে পেরেছে। ফুলের চাষ, মাছের চাষ, সবজির বাগান তৈরির ক্ষেত্রে এদের অফুরন্ত সৃজনশীলতা আমাদের সত্যি আশাবাদী করে তোলে।

আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এসব খুদে কারিগরের জন্যে আমরা আমাদের বাজেট, খুদে ও মাঝারি ঋণ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার মাধ্যমে কী করে প্রয়োজনীয় অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারি। আমাদের নীতি আলোচনাতেও এই খুদে উদ্যোক্তা ও কারিগরদের চাওয়া-পাওয়ার কথা যেন উঠে আসে সেদিকে নীতি-নির্ধারকদের সর্বদাই খেয়াল রাখতে হবে। ফাওসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নজর এই মাটি ঘেঁষা দেশি অনানুষ্ঠানিক কারিগরদের দিকে প্রসারিত রাখতে হবে। আমাদের উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে এদের সপক্ষে নীতি আনুকূল্য তৈরির আলাপ করার এখনই সময়। আর অর্থ ছাড়া শুধু কথায় চিড়ে ভিজবে না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের কৃষির টেকসই উন্নয়নের জন্যে যেমন অর্থ ও বাজেটারি সমর্থনের প্রয়োজন হবে তা আমাদের সুযোগ্য কৃষিমন্ত্রী ঠিকই আদায় করে নিতে পারবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও তাঁকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন সে প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি। কেননা, কৃষি বাঁচলেই যে দেশ বাঁচবে। সম্প্রতি হাওর অঞ্চলের কৃষিতে যে দুর্যোগ নেমে এসেছে তা মোকাবিলাসহ সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের বৃহত্তর কৃষির উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন আসন্ন বাজেটে থাকবে সে প্রত্যাশা করাটা নিশ্চয় অন্যায় হবে না।

লেখক :উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

ই-মেইল: dratiur¦gmail.com









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]