Tuesday, 12 November, 2019, 4:29 AM
Home
আমি শিক্ষক—এ আমার অহংকার
হোসনে আরা বেগম লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Friday, 28 April, 2017 at 3:10 PM, Count : 62
সে কবেকার কথা। গুরুগৃহে বসবাস করে, গুরুর আদেশ, উপদেশ, নিষেধ মেনে, গুরুর যাবতীয় কাজ-কর্ম করে দিয়ে শিষ্য দীক্ষা গ্রহণ করত। তখন গুরুকে অনেক বেশি মান্য-গণ্য করা হতো। আজ এসব কথা অবিশ্বাস্য হলেও এটিই ছিল সত্য। গুরুর সম্মান ছিল আকাশচুম্বী। গাছের প্রথম ফল, হাঁস-মুরগির ডিম, পুকুরের মাছ অনেক শ্রদ্ধা-ভক্তিভরে মসজিদ, মন্দির আর গুরুগৃহে দেওয়া হতো। গুরু নিঃসন্দেহে তখন সকলের শ্রদ্ধেয় ছিলেন।

কালক্রমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রসার হতে লাগল। গুরু তথা শিক্ষকের সংখ্যাও বাড়তে লাগল। শিক্ষকদের স্বল্প বেতনে পরিবার-পরিজন নিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠল। তবুও শিক্ষক তাঁর অহংকে ধরে রাখার চেষ্টা করতেন। আজকালকার মতো প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষার্থীদের নকল সাপ্লাই—এসব অপকর্ম শিক্ষকদের তেমন করতে দেখা যেত না।

বর্তমান চিত্র ভিন্ন। এখন শিক্ষকরা টাকার জন্যে টিউশনির পর টিউশনি করেন। অতিরিক্ত খাটা-খাটনির ফলে তাদের জীবনে স্বাভাবিকভাবেই ক্লান্তি নেমে আসে। শিক্ষক তাই তার পবিত্র শিক্ষা দানে ফাঁকি দেওয়া শুরু করেন।

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ ‘শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার ও দায়িত্ব’ শীর্ষক শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘প্রাথমিক স্তর থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত সর্বত্র শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মেধাবী শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষকতায় আগ্রহী এবং সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে সকল স্তরের শিক্ষকদের মর্যাদার বিষয় গভীরভাবে বিবেচনাপূর্বক পুনর্বিন্যাস করা হবে যাতে তারা যথাযথ মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের অধিকারের সঙ্গে তাদের দায়িত্বের সামঞ্জস্য থাকতে হবে। শিক্ষকদেরকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পাঠদানসহ তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পাদন করতে হবে। শিক্ষার পরিবেশ ও মান যাতে উন্নত হয় সেদিকে সংশ্লিষ্ট সকলের যথাযথ ভূমিকা রাখতে হবে।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে সু-অভ্যাস গঠন করার মাঝেই শিক্ষকের সার্থকতা। শিক্ষককে অনেক মার্জিত, অনেক আত্মত্যাগী হতে হবে। এমন পেশায় আত্মনিয়োগকারীকে অবশ্যই সুন্দর নৈতিকতাপূর্ণ আদর্শের প্রতীক হতে হবে। আমি আমার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আজিমপুর গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইনস্ স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষকদের প্রায়ই বলতাম, এটা আপনাদের সৌভাগ্য, আপনারা এমন একটা মূল্যবান পেশায় নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পেরেছেন। শিক্ষকদের মাঝে যাতে হীনমন্যতার জন্ম না হয়, সেজন্যে তাদের উদ্বুদ্ধ করতে লাগলাম। তারা যে শিক্ষক, এ কথাটি যেন গর্বভরে স্মরণ রাখতে পারেন, সেজন্যে তাদের জন্য প্রতিষ্ঠান থেকে সরবরাহকৃত ডায়েরির কভার পৃষ্ঠায় লিখে দিলাম,‘ আমি শিক্ষক—এ আমার অহংবোধ’।

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী বলা যায়, যে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মনে সুকুমার বৃত্তি জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হবেন, যিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে শ্রমশীলতা, সহনশীলতা, ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের অভ্যাস গঠন করতে পারবেন এবং যিনি শিক্ষার্থীদের কুসংস্কারমুক্ত, দেশপ্রেমিক এবং সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তুলতে পারবেন, তিনিই হবেন উত্তম শিক্ষক। তিনি নিঃসন্দেহে শিক্ষার্থীদের জন্যে ভালো পথপ্রদর্শক, সহযোগিতাকারী এবং পরিচালক হবেন।

যিনি গুরু হবেন, তাঁকে অনুসরণ ও অনুকরণ করে সবাই শিক্ষা গ্রহণ করবে—এটাই যেন স্বাভাবিক হয়। শিক্ষককে সর্বদা ন্যায়নীতির সঙ্গে আপসহীন থেকে শিক্ষার্থীদের মেধা, আত্মশক্তির বিকাশ সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। আজ এই মহান পেশা কতিপয় ব্যবসায়ী মানসিকতার শিক্ষকের জন্যে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। তারা অনৈতিকভাবে টিউশনি বা কোচিং ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এ বিষয়টা প্রকৃত শিক্ষক যারা, তাদের জন্যে মর্যাদার বিষয় তো নয়ই বরং বিব্রতকর। আমার বিশ্বাস, নিয়ম-শৃঙ্খলার ভেতর দিয়ে চললে শিক্ষক সমাজ আনন্দঘন পরিবেশের মাঝে তাদের জীবনকে সার্থক করে তুলতে পারবেন।

দেশের শিক্ষার অগ্রগতিতে শিক্ষক সমাজের যোগ্যতা,দক্ষতা ও তার শিক্ষা দানের আগ্রহের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। ক্ষুধার্ত, অভাবী শিক্ষক দিয়ে যথাযথ শিক্ষা দান সম্ভব নয়। তাদের চিকিত্সা, বাসস্থান, বেতন ভাতা ও প্রাপ্য মর্যাদার দিকে সরকারকে নজর দিতে হবে—নজর দিতে হবে শিক্ষক যাতে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানসম্পন্ন জীবন-যাপন করতে পারেন। তবে আশার বিষয় হলো, বর্তমান সরকার শিক্ষকের বেতন ভাতা আগের থেকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন।

সরকার কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করার জন্যে ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা ২০১২’ জারি করেছেন। নীতিমালায় উল্লেখ আছে, কোনো শিক্ষক তার নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং করাতে পারবেন না। তবে নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের সীমিত সংখ্যক (দশ জনের বেশি নয়) শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন। নীতিমালায় আরও একটা বিষয় সংযোজিত হয়েছে। তা হলো, প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরও পড়াতে পারবেন। সেক্ষেত্রে কত টাকা নেওয়া যাবে, কোন্ খাতে কত খরচ করতে হবে, তা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এ নীতিমালা মেনে চললে শিক্ষকদের অন্তত অনটনে থাকতে হবে না, তারা হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন।

প্রকৃত শিক্ষকই পারেন বিরাট জনশক্তিকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করে দেশের অগ্রগতিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে। এ মহত্ কাজ করার জন্যে শিক্ষককে মনে রাখতে হবে যে শিক্ষকতা শুধুমাত্র পেশা নয়, এটা একটা সেবামূলক পেশা। সবশেষে বলা যায়, একজন আদর্শ শিক্ষকের যেসব গুণাবলি থাকা প্রয়োজন, সেসব গুণাবলি যদি একজন শিক্ষক অর্জন করতে পারেন, তাহলেই তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে বলতে পারবেন, আমি শিক্ষক—এ আমার অহংকার।

লেখক : প্রাক্তন উপদেষ্টা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস্ স্কুল এন্ড কলেজ; প্রাক্তন অধ্যক্ষ, ভিকারুননিসা

নূন স্কুল এন্ড কলেজ এবং প্রাক্তন অধ্যক্ষ,

আজিমপুর গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]