Wednesday, 8 July, 2020, 5:14 AM
Home
বিলম্বিত বিচার মূলত বিচার অস্বীকারের শামিল
মো. জসিম উদ্দিন লিখেছেন কালেরকন্ঠে
Published : Friday, 28 April, 2017 at 3:10 PM, Count : 67
আজ ২৮ এপ্রিল ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস’। চলতি বছর পঞ্চমবারের মতো বাংলাদেশে সরকারিভাবে দিবসটি উদ্যাপিত হচ্ছে। ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস’ ঘোষণার মুখ্য উদ্দেশ্য হলো দিবসটি উদযাপনের মাধ্যমে সরকারি আইনিসেবার বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ পৃথিবীর বহু দেশে আইনগত সহায়তা দিবস উদ্যাপিত হয়। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে Law Day I Legal Services Day—দুটিই উদ্যাপিত হয়। আইনগত সহায়তা বিষয়ে জনমত তৈরি করাই শুধু নয়, আইনি বিষয়াদি, বিশেষত আইনি সুরক্ষাসংক্রান্ত বিষয়ে জনগণকে সচেতন করে তুলতে এ ধরনের দিবস উদযাপন খুবই তাত্পর্যপূর্ণ।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩৩ নম্বর অনুচ্ছেদে আইন সহায়তাব্যবস্থার মূল চেতনা পরস্ফুিট হলেও কাঠামোগতভাবে বাংলাদেশে আইনগত সহায়তার ধ্যানধারণা একেবারেই নতুন। পদ্ধতিগত বিভিন্ন আইন যেমন, দেওয়ানি ও ফৌজদারি কার্যবিধিতে আইনগত সহায়তার কথা বলা হলেও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অভাবে এটি বেশ আগেই অকার্যকর হয়ে পড়ে। কিন্তু রাষ্ট্র কখনোই তার নাগরিকদের প্রতি বৈষম্য মেনে নিতে পারে না। আর্থিক অভাবের কারণে কেউ আইনের আশ্রয় নিতে পারবে না—এটি কোনোভাবেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্র হতে পারে না। এ কারণে বাংলাদেশ সরকার ২০০০ সালে আইনগত সহায়তা প্রদান আইন প্রণয়ন করে, যা সময়ে সময়ে সংশোধিত হয়ে ক্রমেই একটি কার্যকর, গতিশীল ও সেবামূলক আইনে পরিণত হয়েছে। এই আইনের আওতায় বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টসহ জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি আইন সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

সরকারি ব্যবস্থাপনায় দরিদ্র মানুষকে আইনিসেবা দেওয়া রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য দায়িত্ব। রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য মূলনীতি হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯(১) নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবে। ’ খ্যাতিমান রাষ্ট্রনায়ক আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন ২০০ বছর আগেই বলে গেছেন, ‘The first duty of society is justice.’ মূলত সমাজ তথা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। যেখানেই ন্যায়বিচার, সেখানেই সমতার প্রশ্ন চলে আসে। ন্যায়বিচার ও সমতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিচারাঙ্গনে সমতা নিশ্চিত করতে আইন সহায়তাব্যবস্থার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আইন সহায়তার মাধ্যমে নিঃস্ব ও দরিদ্র মানুষ বিচারিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে ধনিক শ্রেণির সমান অবস্থানে আসার সুযোগ পায়। সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য একটি সমতল ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। একটি আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সমাজের দরিদ্র, নিঃস্ব ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা বিধান করা। সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে একমাত্র আইন-আদালতের মাধ্যমেই মানুষ তার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। কিন্তু দরিদ্রতা কিংবা অর্থের অভাবে কেউ যদি তার বৈধ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে না পারে অথবা আইনের আশ্রয় লাভ করতে না পারে, তবে তার অন্য সব মৌলিক অধিকারও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। আর্থিক দৈন্যের কারণে কেউ যাতে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয় সে জন্যই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত আইন সহায়তাব্যবস্থার উদ্ভব।

বাংলাদেশে জনকল্যাণমূলক বহু আইন বা প্রতিষ্ঠান থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে মানুষ এর সুফল পাচ্ছে না। কিন্তু সরকারি সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে এটি সারা দেশে সরকারি আইন সহায়তা কার্যক্রমের ব্যাপক প্রসার ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সংস্থার অধীন ‘জেলা লিগ্যাল এইড অফিস’কে ঘিরে বিচারপ্রার্থী মানুষের মধ্যে যে আকাঙ্ক্ষা ও কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে তা পূরণ করা এখন সংস্থার অন্যতম অগ্রাধিকার। দ্রুততম সময়ে মানসম্মত আইনিসেবা নিশ্চিত করা সরকারি আইন সহায়তাব্যবস্থার জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। সম্প্রতি আইনের সংশোধন ও নতুন নতুন নীতিমালা, বিধিমালা ইত্যাদি প্রণয়নের মাধ্যমে আইন সহায়তা কার্যক্রমে ব্যাপক সংস্কার সাধন করা হয়েছে। আইনগত সহায়তার পাশাপাশি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিব্যবস্থাকেও সরকারি আইন সহায়তা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শুধু বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিই নয়, আইনগত শিক্ষা বিস্তার, আইনগত তথ্য সহজলভ্যকরণ, আইনগত মৌলিক ধারণালব্ধ জনগোষ্ঠীর হার বৃদ্ধি করা এবং সর্বোপরি ন্যায়বিচারে সহজ অভিগম্যতা নিশ্চিত করা সংস্থার কার্যপরিধিভুক্ত কর্মসূচি হিসেবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিব্যবস্থাকে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে। মূলত বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ছাড়া বিচার বিভাগে চলমান মামলাজট নিরসন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৬ সাল শেষে সারা দেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৩১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৭৮। পুরনো পরিসংখ্যান থেকেও এটি স্পষ্ট যে বহু বছর ধরে দায়ের করা মামলার সংখ্যা নিষ্পত্তি করা মামলার চেয়ে অন্তত কয়েক লাখ বেশি থাকে। তবে সরকার ও বিচার বিভাগের নানা উদ্যোগের কারণে বর্তমানে মামলা নিষ্পত্তির হার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তথাপি প্রতিবছরই বিচারাধীন মামলার তালিকায় যোগ হচ্ছে অসংখ্য নতুন মামলা। অথচ আগের মামলাই নিষ্পত্তি করতে বিচার বিভাগকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আর এসব কিছুরই অনিবার্য পরিণতি হিসেবে বিচারাঙ্গনে তৈরি হচ্ছে মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও মামলাজট। মামলার বিচার ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিচারব্যবস্থায় বর্তমানে প্রচলিত সেকেলে ধারা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, সমতা—সব কিছুই হুমকির মুখে পড়বে।

ন্যায়বিচার কখনো বিলম্বিত হতে পারে না। বিলম্বিত বিচার মূলত বিচার অস্বীকারের শামিল। রাশিয়ান কবি Yevgeny Yevthushenko বলেছেন, ‘Justice is like a train that is nearly always late.’ কিন্তু বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা এতটাই বিলম্বিত যে পিতামহ কর্তৃক দায়েরকৃত মামলা তাঁর ও তাঁর পুত্রের সময়কাল নিঃশেষিত করে নাতির জীবদ্দশায় নিষ্পত্তি হচ্ছে। একটি দেওয়ানি মামলার ভার তিন পুরুষ ধরে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এমনকি মামলা চালানোর মোট ব্যয়, বহু ক্ষেত্রে মামলার মোট মূল্যমানকেও অতিক্রম করছে। বছরের পর বছর মামলার গ্লানি টানতে গিয়ে মামলার পক্ষরা একদিকে নিঃস্ব হচ্ছে, অন্যদিকে বিচার বিভাগের প্রতি এসব মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি ওয়ারেন বার্জার ওয়ার্ল্ডনেট এক সাক্ষাত্কারে স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘সম্ভাব্য ন্যূনতম ব্যয়ে, ন্যূনতম সময়ে ও পক্ষদের ওপর সামান্য চাপ রেখে ন্যায়বিচার সাধন করাই হবে বিচার বিভাগীয় পদ্ধতির কাজ। ’ চারদিক থেকে স্রোতের মতো আসা মামলার লাগাম এখনই টেনে ধরতে হবে। একই সঙ্গে ছোটখাটো ও আপসযোগ্য বিরোধগুলো আদালতের বাইরে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে। এতে মানুষের মধ্যে সামাজিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে। মামলার পক্ষদের অর্থ ও সময়—দুটিই সাশ্রয় হবে। আপস-মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা সমাধানে কোনো পক্ষই হারে না, বরং উভয় পক্ষই জেতে। এ কারণে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসকে ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির কেন্দ্রস্থল’ হিসেবে ব্যবহারের যে ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। লিগ্যাল এইড অফিসকে ঘিরে একটি কার্যকর ও টেকসই বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য রাষ্ট্র আরো উদ্যোগী হবে এবং এর দ্বারা সত্যিকার অর্থেই বিচারপ্রার্থী মানুষ উপকৃত হোক—এটিই আমাদের প্রত্যাশা।



লেখক : অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, ঢাকা











« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]