Wednesday, 23 September, 2020, 5:25 AM
Home
দক্ষতার ঘাটতি মোকাবিলায় বরাদ্দ চাই
প্রাক্‌–বাজেট ভাবনা
মুনির হাসান লিখেছেন প্রথম আলোয়
Published : Wednesday, 26 April, 2017 at 2:24 PM, Count : 28
বাংলাদেশে চাকরির খবর ও আবেদনের বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইট এখন জনপ্রিয়। পত্রিকার পাশাপাশি এখন এই জব সাইটগুলোতেই নিয়োগপ্রত্যাশীরা বেশি খোঁজ রাখেন। তবে আমি আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, আমাদের দেশের কিছু শূন্যপদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে ভারতের জনপ্রিয় চাকরির ওয়েবসাইটে। আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, এসব পদের নিয়োগকারীরা আসলে ভারতীয় বা শ্রীলঙ্কার প্রার্থী খুঁজছেন বলে সেখানে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে।

এই নিবন্ধ লেখার সময় (২২ এপ্রিল ২০১৭) ভারতের একটি চাকরির ওয়েবসাইটে ৮৯টি পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি আমার চোখে পড়েছে। এগুলোর কোনোটি এন্ট্রি লেভেল কিংবা শিক্ষানবিশদের জন্য জন্য নয়। অধিকাংশ মধ্যম ব্যবস্থাপক কিংবা ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপকের জন্য। এ ছাড়া রয়েছে ফ্যাশন, গ্রাফিকস ডিজাইনার। এমনকি বিক্রয়কর্মীর বিজ্ঞপ্তিও চোখে পড়েছে। আর এসব বিজ্ঞাপনের শতকরা ৯০ ভাগই তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল কিংবা সে রকম শিল্পের জন্য।

এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমাদের তৈরি পোশাকশিল্প বা সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর অগ্রসরমাণতার সঙ্গে আমাদের মানবসম্পদের ফারাকটা প্রতিনিয়ত বেড়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে কোনো এক সংবাদে জানতে পেরেছি, বাংলাদেশে যেসব বিদেশি কর্মী রয়েছেন, তাঁরা বছরে ৩০ হাজার কোটির বেশি টাকা দেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছেন। এই অঙ্কটি আমাদের চলতি বাজেটের প্রায় ১০ শতাংশ! নেহাত কম টাকা নয়।

আমাদের মতো দেশে যেখানে জনসংখ্যা উদ্বৃত্ত, সেখানে দক্ষ কর্মীর এই হাহাকারের কারণ কী? কেন আমাদের মধ্যম বা উচ্চস্তরের ব্যবস্থাপক, ডিজাইনার কিংবা পরিকল্পনাকারী তৈরি হচ্ছে না? দোষটা কি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের? একটি দেশে মধ্যম ও উচ্চপর্যায়ের কর্মী তৈরির কাজটা আসলে বিশ্ববিদ্যালয় করে না। এটি সংশ্লিষ্ট শিল্পকেই করতে হয়। দেশের ১০ হাজার শাখা ব্যাংকের কোথাও কোনো বিদেশিকে দেখা যায় না। তার মানে দাঁড়াল, আমাদের ব্যাংকগুলো তাদের কর্মীদের তৈরি করার ব্যাপারে যতখানি সফল, অন্য সেক্টরগুলো সেভাবে সফল হচ্ছে না।

এর একটা কারণ হলো, প্রায় সব ব্যাংকের কর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য নিজস্ব ইনস্টিটিউট রয়েছে, সেই সঙ্গে রয়েছে ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট বা বিআইবিএমের মতো প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আমাদের গার্মেন্টস সেক্টরের ক্ষেত্রে সে রকম প্রতিষ্ঠান কই? এটা কি কারণ যে অনেকে ভাবেন, গার্মেন্টস কেবল আমাদের গ্রাম থেকে আসা মেয়েরাই চালিয়ে নেবে আর ডিজাইন কিংবা বিপণনের কাজগুলো করার জন্য আমরা ছয় থেকে সাত লাখ কর্মীকে দেশের বাইরে থেকে ভাড়া করে আনব?

এই সমস্যার সমাধানে দুটি বিশেষ উদ্যোগের দরকার। প্রথমত, বিভিন্ন সেক্টরে (বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, চামড়াজাত শিল্প) মধ্য ও উচ্চমানের ব্যবস্থাপক তৈরির জন্য প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলা। হিসাবে বলে এগুলো করবে বেসরকারি উদ্যোগ। তবে দরকার সরকারি প্রণোদনাও। আর যত দিন এ প্রতিষ্ঠানগুলো বড় আকারে তৈরি হবে না, তত দিন সরকারি উদ্যোগে প্রয়োজনে বিপুলসংখ্যক কর্মীকে দেশের বাইরে থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আনতে হবে।

এ ব্যাপারে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের অধীন হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের উদ্যোগকে অনুসরণ করা যেতে পারে। ২১ এপ্রিল কারওয়ান বাজারের জনতা টাওয়ার সফটওয়্যার পার্কে একদল তরুণ তথ্যপ্রযুক্তিকর্মীর সঙ্গে দেখা হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে জানতে পারলাম, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত তাঁরা ভারতের অন্যতম শীর্ষ তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইনফোসিস থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন। বিশ্বমানের এ প্রশিক্ষণের জন্য তাঁদের নিজেদের কানাকড়িও খরচ হয়নি। এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছে হাইটেক পার্কের চলমান সাপোর্ট টু কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক প্রকল্প।

প্রকল্পের পরিচালক জানালেন, দরখাস্ত আহ্বান করে একটা সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে ৯৮ জনকে এই প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচন করা হয়। প্রশিক্ষণার্থীদের যাতায়াত ও খাওয়ার খরচ প্রকল্প থেকে বহন করা হয়েছে এবং আতিথেয়তার নমুনা হিসেবে ইনফোসিস কোর্স ফি বা আবাসনের খরচ নেয়নি। প্রশিক্ষণ থেকে ফেরার পর এই তরুণ ৯৮ জন তথ্যপ্রযুক্তিবিদের মধ্যে ২৬ জন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন, ৫ জন উচ্চশিক্ষার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং ৬৪ জন বিভিন্ন বেসরকারি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়েছেন। অনুষ্ঠানে তাঁরা সবাই ইনফোসিসের ওই প্রশিক্ষণের প্রশংসা করার পাশাপাশি এটিও বলেছেন যে এ ধরনের প্রশিক্ষণ একাডেমি দেশেও গড়ে তোলা সম্ভব।

প্রকল্প পরিচালক আরও জানালেন, তাঁর প্রকল্প থেকে ডেটাসফট নামের একটি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ৩০০ কর্মীকে ইন্টারনেট অব থিংসের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তাঁরা জাপানের সঙ্গে কাজ করতে পারেন। হাইটেক পার্কের এই উদ্যোগ থেকে এটি সহজে অনুমেয় যে সরকার ইচ্ছা করলে বেসরকারি পর্যায়ের কর্মীদের দক্ষতা ও পেশাদারি উন্নয়নের জন্য কাজ করতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যদি এমনটি হতে পারে, তাহলে তৈরি পোশাক বা বস্ত্রশিল্পের বেলায় এমনটি কেন হবে না?

প্রস্তাব করি, চলতি অর্থবছরে তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে মধ্যম ব্যবস্থাপক তৈরির জন্য মাত্র ১০০ কোটি টাকার একটি থোক বরাদ্দ রাখা হোক। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়ে দুই খাতের কমপক্ষে পাঁচ হাজার কর্মীকে এ অর্থে দেশে কিংবা বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আনা হোক। দরকার হলে তাঁরা দেশে ফিরে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মানোন্নয়নের জন্য কাজ করবেন, এমন শর্তও জুড়ে দেওয়া যায়। মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশে শতভাগ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশ হয়েছে, ‘দেশ গার্মেন্টস’–এর ১৩৮ জন কর্মীর মাধ্যমে যাঁরা দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছিলেন।

সমন্বিত উদ্যোগ নিলে আগামী তিন বছরেই তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্প বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও কর্মীদের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে পারবে।

মুনির হাসান: সমন্বয়ক, যুব কর্মসূচি, প্রথম আলো।









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]