Wednesday, 8 July, 2020, 5:05 AM
Home
সুনামগঞ্জে ব্যবসায় হলুদ বাতি
মশিউল আলম, সুনামগঞ্জ থেকে লিখেছেন প্রথম আলোয়
Published : Wednesday, 26 April, 2017 at 2:24 PM, Count : 69
সুনামগঞ্জ শহরের পৌর মার্কেটের এক ভবনের দোতলায় ক্যামেলিয়া টেইলার্সের কারখানা। এক যুবক তিন কিশোর সহকর্মীর সঙ্গে কাজ করছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কাজকর্ম কেমন?’ তিনি হাতের কাঁচিটা রেখে বললেন, ‘ভালো না। বছরের এই সময় নতুন ধান ওঠে, মানুষের হাতে টাকাপয়সা আসে, তারা নতুন কাপড়চোপড় বানায়। কিন্তু এবার সব ধান গেছে, আমাদের ব্যবসা হইতেছে না।’

আমি তাঁর হাতের কাজ দেখিয়ে বললাম, ‘এই তো কাজ করছেন।’

বললেন, ‘করতেছি, কিন্তু আগের তুলনায় অনেক কম। মানুষ খরচ করতেছে না। সামনে অভাব আরও বাড়বে। তখন আমাদের ব্যবসা আরও খারাপ হবে। কাজকর্ম পুরাপুরি বন্ধও হইয়া যাইতে পারে।’

‘তখন কী করবেন?’

মলিন হেসে বললেন, ‘আল্লায় জানে।’

আমি ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিতে যাচ্ছি, তিনি বললেন, ‘চা খান।’

আমি তাঁকে আবার ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নিলাম।

সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে দেখি, সারি সারি দোকান প্রায় ক্রেতাশূন্য। বিকেলে বাজারে-মার্কেটে যে কোলাহল থাকে, তা নেই, কেমন যেন ঝিম মেরে আছে পুরো মার্কেট।

‘ইউনিক টেলিকম’ নামের এক মোবাইল ফোনসেটের দোকানের কাউন্টারে গালে হাত দিয়ে বসে আছেন এক যুবক। কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ব্যবসা কেমন?’ তিনি বললেন, ‘আগে দিনে ১০-১৫টা সেট বিক্রি হতো। এখন হয় দুই-তিনটা, কোনো কোনো দিন একটাও না। আমাদের ব্যবসা তো কৃষকের ওপর নির্ভরশীল, তাদের অবস্থা খারাপ হলে আমাদের ব্যবসাও খারাপ হবে, এটাই স্বাভাবিক।’ বললাম, ‘সামনে কৃষকের অবস্থা তো আরও খারাপ হবে, তখন আপনার ব্যবসার কী হবে?’ তিনি বললেন, ‘ব্যবসা হয়তো আর চলবে না। কিন্তু আমার সমস্যা হবে না, আমার বাবা সবজি ব্যবসায়ী। কিন্তু অনেকের অনেক সমস্যা হবে। অনেক দোকান উঠে যাবে।’

শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা-তোয়ালে, ছিটকাপড়ের দোকান ‘বেলা বস্ত্রালয়ের’ মালিক ক্ষীতিশ রায়ের (৫৬) দোকানেও কোনো ক্রেতা নেই। গল্পে গল্পে জানলাম, তাঁর পরিবারে সদস্যসংখ্যা পাঁচ। সব ছেলেমেয়ে স্কুল-কলেজে পড়ে, এই দোকানই তাঁর আয়ের একমাত্র উৎস। তিনি বললেন, আগে দৈনিক সাত-আট হাজার টাকার পণ্য বিক্রি হতো, এখন এক হাজার টাকারও হয় না।

দোকানের নাম ‘মধ্যবিত্ত’। বিক্রি হয় তৈরি পোশাক আর গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধের বই। পণ্যে ঠাসা ছোট্ট ছিমছাম দোকানটার ভেতরে গল্প করছে তিন তরুণ। আলাপ শুরু করলে জানতে পারলাম, তাদের একজন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছে। একজন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়েছে আর একজন সপ্তাহে এক দিন কলেজে যায়। যথাক্রমে এক হাজার, এক হাজার ও আড়াই হাজার টাকা বেতনে তারা এই দোকানে চাকরি করে। আমার জিজ্ঞাসার উত্তরে তারা বলে, ‘বিক্রি খুব কমে গেছে। আগে দৈনিক বিক্রি ছিল সাত-আট হাজার, এখন দেড়-দুই হাজার।’ বললাম, ‘এই অবস্থা চলতে থাকলে মালিক কি আপনাদের চাকরিতে রাখবে?’ একজন বলল, ‘আমরা কী বলব? আল্লায় ফসল নিয়া গেছে, মানুষের হাতে টাকা নাই।’

ডিএস রোডের ধারে বড়সড় দোকান ‘মা ইলেকট্রনিকস’। সিলিং ফ্যান, টেবিল ফ্যান, মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ ইত্যাদি ইলেকট্রনিক সামগ্রীর পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা। ম্যানেজার রুকনউদ্দিন বললেন, ‘আগে দৈনিক ২০-২৫ হাজার টাকার মালামাল বিক্রি হতো। এখন বিক্রি নেমে এসেছে চার-পাঁচ হাজার টাকায়। ঘর ভাড়া, ম্যানেজারসহ ছয়জন কর্মচারীর বেতন—এসব নিয়ে ভীষণ আর্থিক সংকট শুরু হয়ে গেছে। তবে এটা সবে শুরু। হাহাকার শুরু হবে দুই-তিন সপ্তাহ পর থেকে। মানুষ মানুষরে কামড়াইয়া খাইব শুধু অভাবের কারণে। আমার তো মনে হইতেছে, সুনামগঞ্জ থাকিই শুরু হইবে শ্রেণিবিন্যাস।’ বুঝলাম তিনি শ্রেণিসংগ্রাম বলতে চাইছিলেন। হেসে বললাম, আপনি কি বরুণ রায়ের দল করেন? রুকনউদ্দিন হেসে মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘না না। কিন্তু সত্যই সুনামগঞ্জে এখন শ্রেণিবিন্যাসের পরিস্থিতি।’

সুনামগঞ্জের সবচেয়ে জমজমাট ব্যবসা করে যে জুতোর দোকান, সেই প্রিন্স শু স্টোরের মালিক মোহাম্মদ নূরে আলমকে বললাম, ‘আপনাদের ব্যবসার অবস্থা কী?’ তিনি প্রায় চিত্কার করে উঠলেন, ‘মারাত্মক অবস্থা, মারাত্মক! এই যে হারা দিন বইসা রইছি, কাস্টমারই আসে না। আগে দিনে ৩০-৩৫ হাজার টাকার জুতা বিক্রি হইত; এখন ৮-১০ হাজার টাকারও হয় না।’ সুনামগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের একজন পরিচালক নূরে আলম অনেক কথা বলার পর বক্তৃতার সুরে বলতে লাগলেন, ‘সরকারের কাছে বিশেষ অনুরোধ, ক্ষুধার্ত মানুষকে সহযোগিতা দিতে হবে।’ আমি বললাম, ‘কিন্তু তাতে তো আপনার জুতা বিক্রি বাড়বে না।’ তিনি বললেন, ‘তা বাড়বে না। আমরা নাহয় একটু সহ্য করলাম। কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষগুলা তো বাঁচবে।’

সিঙ্গার ইলেকট্রনিক সামগ্রীর বিশাল শোরুমের এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে আছেন কর্মচারীরা, কাউন্টারে বসে আছেন ডিলার এনামুল হক। বললেন, ‘৫০ শতাংশ বিক্রি কমে গেছে। যারা কিস্তিতে জিনিস কিনেছে, তারাও কিস্তি পরিশোধ করছে না। কেউ সময় চাচ্ছে, কেউ কেউ মাফও চাচ্ছে। সামনে অবস্থা আরও খারাপ হবে। তখন কর্মচারী ছাঁটাই করেও টিকে থাকা যাবে কি না সন্দেহ।’

ওয়ালটনের কর্মীরা বললেন, তাঁদের বিক্রি কমে গেছে ৬০ শতাংশ।

অ্যাপেক্সের কর্মীরা বললেন, তাঁদের বিক্রি কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।

অবস্থা যখন এই, তখন কি সোনার অলংকারের দোকানে ঢোকার প্রয়োজন আছে? কী নতুন কথা শুনতে পাব ওখানে? কিন্তু ‘রাজশ্রী জুয়েলার্স’-এর কাউন্টারে হেলান দিয়ে অলস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে দেখে তাঁর সঙ্গে কথা বলার লোভ সামলানো গেল না। ঢুকলাম দোকানটাতে; বিক্রি-বাট্টার প্রসঙ্গ না তুলে সুখদুঃখের গল্প শুরু করলাম। জানলাম, তাঁর নাম গৌতম, বয়স ৪৮, তিনি রাজশ্রী জুয়েলার্সের ম্যানেজার। তাঁর সংসারে পাঁচজন মানুষ। বেতন কত পান? জিজ্ঞাসা করলাম ভব্যতার মাথা খেয়ে; বেচারি বিব্রত হলেন, বেতনের অঙ্কটা বললেন না, শুধু বারবার বললেন, ‘খুবই স্বল্প বেতন, খুবই স্বল্প।’ তারপর নিজে থেকেই বললেন, ‘কিন্তু এই স্বল্প বেতনও হয়তো আর পাওয়া যাবে না। মালিক নিজেই না বাঁচলে কর্মচারী রাখবে?’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘কী যে অবস্থা হবে!’

বেচারি গৌতমের দুরবস্থা অনিবার্য; কেননা, তাঁর নিয়তি তাঁকে সুনামগঞ্জের এক সোনার অলংকারের দোকানের কর্মচারী করেছে, যে সুনামগঞ্জে এখন অলংকার কেনা দূরে থাক, খাদ্য কেনার লোকেরই অভাব দেখা দিয়েছে।

সত্যিই, ‘তাহিতি রেস্টুরেন্ট’ নামের এক ভাতের হোটেলে ঢুকে জানতে পেলাম, কাস্টমার কমে গেছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। আগে সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বিক্রি হতো ২০-২৫ হাজার টাকার, এখন হয় ১২-১৫ হাজার।

মিষ্টির কথা বলাও প্রায় স্বর্ণালংকারের কথা বলার মতোই বাহুল্য হবে। ‘দেশবন্ধু মিষ্টান্ন ভান্ডারের’ ম্যানেজার রিপন পাল বললেন, বিক্রি নেমে গেছে অর্ধেকের নিচে, তাঁরা এখন অর্ধেক মিষ্টি বানাচ্ছেন। তাঁর আশঙ্কা, আগামী এক বছর মিষ্টির ব্যবসা হবে না: ‘মানুষ ভাতই পাইব না, মিষ্টি খাইব কী?’

মিষ্টি খাওয়ার মতো রিকশায় চড়াও শখের ব্যাপার কি না, তা সুনামগঞ্জের লোকদের জিজ্ঞাসা করা হয়নি। তবে নুরু মিয়ার মতো এক ডজন রিকশাচালক আমাকে বলেছেন, ‘মানুষ রিকশায় চড়ে না, হাঁইট্যা যায়, দুইডা ট্যাকা বাঁচায়। ঘরে তো অভাব।’

ঘরে অভাব দেখা দিলে রোগবালাইও কি পালিয়ে যায়? সুনামগঞ্জে এখন অনেকটা সে রকমই ঘটছে। ওষুধের বিক্রিও কমে গেছে। ‘সিটি ফার্মেসি’র কাউন্টারে জিজ্ঞাসা করে জানতে পেলাম, তাঁদের ওষুধ বিক্রি কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। বিক্রয়কর্মীটি বললেন, ‘অভাব সবে শুরু হইছে। এটার এফেক্ট আর এক মাস পর থেকে আরও প্রকটভাবে পাওয়া যাবে।’ সুনামগঞ্জের খুব ব্যস্ত ওষুধের দোকান ‘সেন্ট্রাল ফার্মেসি’র বিক্রিও কমে গেছে ২৫-৩০ শতাংশ।

ওষুধ বিক্রি কমে যাওয়ার কারণ কী? এই প্রশ্নের উত্তরে উভয় দোকান থেকেই বলা হলো, মানুষ সাধারণ সর্দি-কাশি, মাথাব্যথা, গ্যাস্ট্রিক ইত্যাদির ওষুধ আগের তুলনায় কম কিনছে। ‘সেন্ট্রাল ফার্মেসি’র কাউন্টারের ভদ্রলোকও বললেন, ব্যবসার মন্দা সবেমাত্র শুরু হয়েছে। এখনো মানুষের ঘরে কিছু খাবার আছে, হাতে কিছু টাকা আছে। কিন্তু যতই দিন যাবে, ততই অভাব প্রকট হবে। কারণ, নতুন ফসল আসবে আবার সেই এক বছর পর। এই পুরো একটা বছর মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমতে কমতে শূন্যের ঘরে পৌঁছাবে।

তার মানে, সুনামগঞ্জে ব্যবসা-বাণিজ্যে সবেমাত্র হলুদ বাতি জ্বলে উঠেছে, কিন্তু লাল বাতি জ্বলে উঠতে বেশি সময় লাগবে না।

কোনো জনপদের প্রায় সব কৃষকের প্রধান ফসলের ৯০ শতাংশ নষ্ট হলে তার ফল কত বিচিত্রমুখী ও সুদূরপ্রসারী হতে পারে, তা নিয়ে কোনো অর্থনীতিবিদ বা সমাজবিজ্ঞানী যদি গবেষণা করতে চান, তাহলে তাঁর জন্য বিরাট এক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে সুনামগঞ্জে। ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাঁদের মনের কত রকমের কথা যে শুনতে পেলাম, সেই ফিরিস্তি লিখতে সংবাদপত্রের পাতায় অনেক জায়গা লাগবে। শুধু একটা এখানে বলা যায়: যাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁরা প্রায় সবাই নিয়তিবাদী। পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাঁধ নির্মাণকারী ঠিকাদার ও অন্যদের দোষারোপ করার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁরা বলেন, সবই আল্লাহর ইচ্ছা এবং সেই আল্লাহর ওপরই তাঁদের শেষ ভরসা। তিনিই তাঁদের রক্ষা করবেন, তাঁদের জীবন থেমে থাকবে না।

তবে তাঁরা সরকারের কাছেও সহযোগিতা চান। যেমন সুনামগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি খায়রুল হক আমাকে টেলিফোনে বললেন, যেসব ব্যবসায়ী ব্যাংক ঋণ নিয়েছেন, তাঁদের সুদ যেন মওকুফ করা হয়। কিন্তু তা যদি করাও হয়, তবু কি ব্যবসা-বাণিজ্যের হলুদ বাতির লাল হওয়া ঠেকানো যাবে? মানুষের ক্রয়ক্ষমতা শূন্য হয়ে গেলে কি ব্যবসা-বাণিজ্য চলতে পারে?

মশিউল আলম: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।
[email protected]








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]