Tuesday, 4 August, 2020, 2:50 PM
Home
নতুন আইন প্রযুক্তিবান্ধব ও ব্যয় সাশ্রয়ী
অরুণ কুমার বিশ্বাস লিখেছেন সমকালে
Published : Wednesday, 26 April, 2017 at 2:24 PM, Count : 34
১ জুলাই ২০১৭ তারিখ থেকে দেশব্যাপী চালু হতে যাচ্ছে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন-২০১২, যা 'অনলাইন ভ্যাট আইন' নামে ব্যবসায়ী মহলে সমধিক পরিচিত। নতুন আইন পুরোদস্তুর প্রযুক্তিকেন্দ্রিক। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আপনাকে কষ্ট করে ভ্যাট অফিসে আসতে হবে না, আপনি কাজ করবেন কোলের ওপর রাখা ল্যাপটপে, নয়তো পকেটে থাকা স্মার্টফোনের মাধ্যমে। যিনি ফেসবুক কিংবা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, তিনিই হতে পারবেন ভ্যাট-স্মার্ট।

ধরুন, আপনি নতুন কোনো ব্যবসা শুরু করবেন, রেজিস্ট্রেশন চাই। ব্যস, চাইলেই হয়ে গেল। বসে যান ল্যাপটপে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ওয়েবসাইটে ফরম পাবেন, টুকটুক করে অনলাইনে ফরম পূরণ করুন, প্রয়োজনীয় দলিলাদির স্ক্যান কপি আবেদনের সঙ্গে যুক্ত করুন, তারপর ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেন ভ্যাট অফিসে। ফরম বুঝতে না পারলে কল সেন্টারে কল দিন-১৬৫৫৫। সেখানে কেউ না কেউ মুখিয়ে আছে আপনার সব জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে। কথা বলতে না চাইলে 'এফএকিউ'তে যান, নিজেই বাড়িয়ে নিন আপনার জ্ঞানের বহর।

যারা ইতিমধ্যে ব্যবসা জমিয়ে তুলেছেন, তাদের জন্য আরও অনেক সুবিধা আছে নতুন আইনে। এখন আর মাসান্তে আপনাকে নিজে হাতে করে রিটার্ন দাখিলের জন্য অফিসে আসতে হবে না। সহজতর রিটার্নখানা পূরণ করে প্রযোজ্য ভ্যাট ব্যাংকিং চ্যানেলে পরিশোধ করে মেইল করে দিন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। ব্যস, হয়ে গেল। আবার যদি কোনো বিষয়ে আপনার কোনো রকম ভিন্নমত বা সংক্ষুব্ধ থাকে, তাও আপনি জানাবেন অনলাইনে ই-মেইলের মাধ্যমে। কোনো কর্মকর্তার বিরস মুখ বা রাঙা চোখ দেখে আপনাকে ভড়কাতে হবে না। সেপাই আপনাকে মাঝপথে থামিয়ে দেবে না। কাজ হবে সব প্রযুক্তিভিত্তিক, সেখানে 'মানবিক ভুলেরও' কোনো আশঙ্কা নেই। খরচ কমবে, সময় বাঁচবে; কিন্তু মুনাফা হবে বেশি বেশি।

যাদের বার্ষিক টার্নওভার ৩০ লাখের নিচে, তাদের কোনো ভ্যাটের বালাই নেই। মুনাফা-কামাই পুরোটাই নিজের ঘরে ঢুকবে। কেউ আপনাকে কিছু পুছতেও যাবে না। যদি টার্নওভার হয় ৮০ লাখের নিচে, তাহলে আপনি ভ্যাট নয়, টার্নওভার ট্যাক্স দেবেন মাত্র তিন শতাংশ হারে। কী মজা! কত সাশ্রয়ী বলুন! অর্থাৎ কি-না নতুন আইন ছোটখাটো ব্যবসায়ীদের স্বর্গের চাবি হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে।

ধরুন আপনি দেশে নেই, তাই বলে কি ব্যবসা-বাণিজ্য আটকে থাকবে? কক্ষনো নয়। আপনি দক্ষিণ গোলার্ধে বসেও দিব্যি মুঠোফোনে ভ্যাটবিষয়ক কাজ করতে পারবেন। কোনো রকম দ্ব্যর্থবোধ হলে সোজা কল সেন্টারে ফোন। ওটা কিন্তু 'রাউন্ড দ্য ক্লক' মানে ২৪ ঘণ্টা চালু আছে। তারপরও যদি কাজ না হয় সেক্ষেত্রে এনবিআর নির্ধারিত ভ্যাট স্পেশালিস্ট রয়েছেন। তারা দেবেন আপনাকে ভ্যাট বিষয়ে বিশেষ অভিজ্ঞান।

নতুন ভ্যাট আইনে আরোপনীয় ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ। এ নিয়ে কিছু ব্যবসায়ী ও ভোক্তার মাঝে এক রকম মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। একদল মনে করে, ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে গেলে পণ্যমূল্য বৃদ্ধিসহ কোনো কোনো ক্ষেত্রে পণ্যের বিক্রয় কমে যাবে। আমি এর সঙ্গে একমত নই। প্রথমত, ভ্যাট প্রদান করেন ভোক্তা। ব্যবসায়ীদের ব্যবসা এর ফলে খুব একটা প্রভাবিত হবে না। এটা যেহেতু মূল্য সংযোজনের হারের ভিত্তিতে নিরূপিত হয়, সেক্ষেত্রে রেয়াত-সুবিধা গ্রহণের কারণে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কার্যত কোনো সুযোগ নেই। বরং এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে নৈরাজ্য কমবে। সবাই সিঙ্গেল রেটে ভ্যাট প্রদান করবেন, একই নীতিমালার ছত্রছায়া পাবেন।

পূর্বে তো নানা রকম ভ্যাটহার চালু ছিল, এখন নয় কেন! এমন প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য 'স্ট্যান্ডার্ড প্র্যাকটিস' বলে একটা কথা আছে। সাময়িক সুবিধালাভের জন্য একটি আইনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা সমীচীন নয়। তর্কের খাতিরে আরও বলি, একটা সময় ছিল যখন ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে হোটেল-রেস্তোরাঁর ওপর আরোপনীয় ভ্যাটের হার ১৫ থেকে কমিয়ে ৯ শতাংশ করা হলো। তারা বললেন, হার কমান, ভ্যাটের পরিমাণ বাড়বে। কেউ আর ফাঁকি দেবে না। কিন্তু তাতে উল্টো ফল হয়েছিল। ভ্যাটহার কমানোর পর ব্যবসায়ীরা বললেন, বিক্রয় বাড়েনি অথচ ভ্যাটহার কমেছে; তাই স্বভাবতই প্রদেয় ভ্যাটও আগের চেয়ে কম। এর নাম শুভঙ্করের ফাঁকি। একটি ভুল সিদ্ধান্তের জন্য সরকারের মোটা টাকার ভ্যাট কম আদায় হয়েছিল। প্রচুর ভ্যাট প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেরাই আবার এনবিআরকে অঙ্ক শেখালেন।

নতুন ভ্যাট আইনে ব্যবসায়ীরা প্রকৃতই খোদখালাস ও স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে ব্যবসা করার সুযোগ পাবেন। সম্পূরক শুল্কযুক্ত কিছু পণ্য ছাড়া বেশিরভাগ পণ্যের ক্ষেত্রে ভ্যাট কর্মকর্তারা নিবারক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন না। সেখানে প্রবিষ্ট হবে অডিট বা নিরীক্ষা কার্যক্রম। নতুন ভ্যাট আইন বস্তুত নিরীক্ষাভিত্তিক, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা তাই অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করবেন। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী তার ব্যবসা বিষয়ে অহেতুক প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করবে না।

এই আইনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো অনলাইন বা ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ করে দেওয়া। কিন্তু যন্ত্র বা প্রযুক্তি আমাদের তখনই যন্ত্রণা দেয়, যখন আমরা তাকে জানতে বা মানতে চাই না। অথবা যদি আমাদের সংকল্প থাকে নেতিবাচক, তখন প্রযুক্তি বেগড়বাই করে। যারা সৎভাবে ব্যবসা করবেন, তাদের জন্য এই আইন আশীর্বাদস্বরূপ। এখানে লুকোচুরির কোনো স্কোপ নেই। যন্ত্রকে ফাঁকি দিতে চাইলেও সুবিধা হবে না। কারণ 'ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো' চালু হচ্ছে শিগগিরই। মানে আপনার ব্যবসা সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য তখন ভ্যাটকর্তার নখদর্পণে। তাই আসুন মন খুলে ভ্যাট দিই, নিঃশঙ্ক চিত্তে ব্যবসা করি।

প্রথম সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]