Saturday, 5 December, 2020, 6:19 PM
Home
সড়ক দুর্ঘটনার আর্থিক ক্ষতিও কম নয়
এম এ খালেক লিখেছেন যুগান্তরে
Published : Tuesday, 25 April, 2017 at 4:56 PM, Count : 26
বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এবং সড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ দেশগুলোর অন্যতম। সরকারি পর্যায়ে নানাভাবে চেষ্টা করেও কোনোভাবেই মহাসড়কে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু কমানো যাচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পরিকল্পিতভাবে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হলে এ দুর্ঘটনা অনেকটাই কমে আসতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশই এখন বাংলাদেশকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে বিবেচনা করে। এমনকি যেসব দেশ একসময় বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে উপহাস করত, তারাও এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য অবশ্যই গর্বের বিষয়। কিন্তু দুর্ঘটনা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যর্থতা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। দুর্ঘটনা শুধু যে একেকটি পরিবারকে অসহায় ও বিপন্ন করে দিচ্ছে তাই নয়, দুর্ঘটনার কারণে আমরা এমন অনেক ব্যক্তিত্বকে হারিয়েছি, যাদের শূন্যস্থান পূরণ হতে সময় লাগবে। এ দেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় যে বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যাচ্ছে, অনেক দেশে যুদ্ধেও এত মানুষ মারা যায় না।
সরকার সম্প্রতি সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবিত আইনের বিষয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন মহল থেকে আপত্তি উত্থাপিত হতে শুরু করেছে। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ হলে তিনি বলেন, সরকার সম্প্রতি সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা সরকারের এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু এই আইন প্রণয়নকালে আমাদের সংস্থার পক্ষ থেকে দেয়া পরামর্শগুলোকে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, আমরা সরকারের কাছে প্রস্তাব করেছিলাম, যে আইন প্রণীত হতে যাচ্ছে তার নামকরণ করা হোক ‘সড়ক পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা আইন’। কিন্তু তা করা হয়নি। প্রতিবেশী দেশ ভারত গত বছর তাদের মন্ত্রিসভায় সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত নতুন আইন পাস করেছে। তারা সেই আইনের টাইটেল পরিবর্তন করেছে। তারা আইনটি শুধু মোটর ভেহিকলের ওপর সীমাবদ্ধ রাখেনি, নতুন আইনের নামকরণ করেছে ‘মোটর ভেহিকল অ্যান্ড সুরক্ষা আইন’। বস্তুত ‘সড়ক পরিবহন আইন’ এবং ‘সড়ক পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা আইনের’ মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। সড়ক পরিবহন আইনের আওতায় রয়েছে গাড়িচালক যদি কোনো ভুল করে তাহলে তার শাস্তির ব্যবস্থা করা, জরিমানা আদায় বা ক্ষতিপূরণ আদায় করা ইত্যাদি বিষয়। অথচ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধু যে চালকই দায়ী তা নয়, আরও অনেক কারণেই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। যেমন, রাজপথে চলাচলের ক্ষেত্রে পথচারীদের অজ্ঞতাও সড়ক দুর্ঘটনার জন্য কম দায়ী নয়। বস্তুত পুরো পরিবহন ব্যবস্থাই বর্তমানে এলোমেলো অবস্থার মধ্যে রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী সব পক্ষকে যদি আইনের আওতায় নিয়ে আসা না যায়, তাহলে কোনোভাবেই সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস করা যাবে না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ বা সড়ক নিরাপত্তা বিধানে অন্যান্য খাতের মতো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাজেট বরাদ্দ থাকতে হবে।
দেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় যে বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যায়, তার ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। কারণ যার বাবা মারা যায়, যার স্বামী দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়, কিংবা দুর্ঘটনায় যিনি ভ্রাতৃহারা হন, কেবল তিনিই অনুধাবন করতে পারেন দুর্ঘটনার ক্ষতি কতটা ভয়াবহ ও গভীর। এ ছাড়া দুর্ঘটনার কারণে যিনি বা যারা পঙ্গু হন, তারাই বোঝেন এর যন্ত্রণা কেমন। তাদের সারা জীবন এই ক্ষতির পসরা বয়ে বেড়াতে হয়। দুর্ঘটনার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নিখুঁতভাবে নিরূপণ করা হয়তো সম্ভব নয়। তারপরও বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে দুর্ঘটনার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের চেষ্টা চালানো হয়। জাতিসংঘের এক হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে প্রতিবছর যে আর্থিক ক্ষতি হয় তার পরিমাণ মোট জিডিপির ১ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থের নিরিখে এটা ১৫ হাজার থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থের সামান্য পরিমাণও যদি সড়ক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় করা হতো, তাহলে মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল কিছুটা হলেও মন্থর হতো। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ সেন্টারের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতিবছর ১২ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনার কারণে মারা যায়। এ ছাড়া ৩৫ হাজার মানুষ আহত হয়। জাতিসংঘের অন্য এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে বার্ষিক আরবান গ্রোথ হচ্ছে ৪ শতাংশ, কিন্তু মোটর ভেহিকলের গ্রোথ হচ্ছে ৮ শতাংশ। জাতীয় মহাসড়ক এবং জেলা পর্যায়ে সড়কে চলাচলকারী গাড়িগুলোর মধ্যে মাত্র ৪০ শতাংশ ভালো কন্ডিশনে আছে।
সড়ক পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টদের সবার মাঝেই সচেতনতার অভাব প্রচণ্ডভাবে পরিলক্ষিত হয়। অনেক বিষয়েই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে; কিন্তু কিভাবে পথ চলতে হয় সে ব্যাপারে কাউকে কোনো প্রশিক্ষণ দেয়া হয় না। যারা জীবন হাতে নিয়ে পথ চলেন তারাও জানেন না কিভাবে রাস্তা পার হতে হয়। সিগন্যাল লাইটের নির্দেশনা মেনে চলার প্রবণতা তাদের মধ্যে তেমন একটা দেখা যায় না। রাজধানীসহ মহানগরগুলোতে ওভারব্রিজ বা আন্ডার পাস থাকলেও অনেক পথচারী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তা পারাপার হন। অন্যমনস্ক হয়ে রাস্তায় চলাচলের সময় অনেকেই দুর্ঘটনার মুখোমুখি হন। অনেক পথচারী মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হতে গিয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনায় পতিত হন।
দুর্ঘটনার জন্য বেশকিছু সাধারণ কারণও দায়ী। দেশের অধিকাংশ মহাসড়ক স্বাভাবিক লেভেল থেকে উঁচু এবং আঁকাবাঁকা। উঁচু ও আঁকাবাঁকা রাস্তায় চলাচল করতে গিয়ে গাড়িগুলো প্রায়ই দুর্ঘটনায় পতিত হয়। দূরপাল্লার মহাসড়কে চলাচলকারী গাড়িচালকদের মধ্যে প্রচণ্ড গতিতে প্রতিযোগিতামূলকভাবে গাড়ি চালানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। অনেক সময় একাধিক গাড়ি পাল্লা দিয়ে চলে। এতে দুর্ঘটনা ঘটে। পথচারীদের মাঝে রাস্তা পারাপারের ব্যাপারে সচেতনতার অভাব লক্ষ্য করা যায়। তবে দুর্ঘটনার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী অবশ্যই গাড়িচালকরা। তাদের মধ্যে দ্রুত ডিউটি শেষ করার প্রবণতা রয়েছে। অনেক সময় তারা যাত্রীদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক করতে করতে গাড়ি চালিয়ে থাকেন। বাস কন্ডাক্টররা প্রায়ই ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। এই বিতর্কে গাড়িচালকও অংশগ্রহণ করেন। ফলে তার অন্যমনস্কতার কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে। গাড়িচালকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। আমাদের দেশে যারা গাড়ি চালান, তাদের বেশিরভাগই উত্তরাধিকার সূত্রে গাড়ি চালানো শিখে থাকেন। সাধারণত কোনো উপযুক্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে গাড়ি চালানো শেখার সুযোগ হয় না তাদের। অনেকেই গাড়ির হেলপার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে গাড়ি চালানোর সামান্য কিছু কৌশল শিখে নিয়ে একদিন অনেকটা হঠাৎ করেই গাড়ি চালানো শুরু করেন। আবার গাড়ি চালানো শেখানোর জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের কোনো কোনোটির বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাইয়ে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ এমনই এক দেশ যেখানে অবৈধ অর্থ ব্যয় করলে যে কোনো কিছু অর্জন করা সম্ভব।
গাড়ির চালকদের ওপর যেহেতু যাত্রীদের জীবন-মরণ নির্ভর করে, সেহেতু তাদের প্রশিক্ষণ হতে হবে যথাযথ এবং এ ক্ষেত্রে ভুয়া প্রশিক্ষণ সার্টিফিকেট প্রদানের কোনো অবকাশ নেই। যারা এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত তাদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া মহাসড়কে ধীরগতির অযান্ত্রিক যানবাহন যাতে চলাচল করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। নসিমন, করিমন বা এ ধরনের বিভিন্ন নামে চলাচলকারী ধীরগতির যানবাহন মহাসড়কে চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে মহাসড়কের দুই পাশে ধীরগতিসম্পন্ন যানবাহনের জন্য আলাদা লেন তৈরি করা যেতে পারে। এরা রাস্তার নিচ দিয়ে ক্রসিং করবে। মহাসড়কে দ্রুতগতিতে গাড়ি চলাচলের কারণেও মারাত্মক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়ে থাকে। কিছু যাত্রী আছেন যারা স্বল্প সময়ে গন্তব্যস্থলে যাওয়ার জন্য চালককে দ্রুত গাড়ি চালাতে উদ্বুদ্ধ করেন। তারা একবারও ভেবে দেখেন না, তাদের এই চাওয়া পূরণ করতে গিয়ে কত বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কোনো কারণে চালক যদি দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাতে চান তাহলে যাত্রীদের কর্তব্য হবে চালককে এ কাজ করা থেকে বিরত রাখা। এ ছাড়া হেলপার বা কোনো শিক্ষানবিশ যদি ড্রাইভিং সিটে বসেন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে সেখান থেকে নামিয়ে দিতে হবে। সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। তাই যাত্রাপথে কোনো কারণেই জীবনের ঝুঁকি নেয়া যাবে না।
এম এ খালেক : অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]