Tuesday, 4 August, 2020, 2:44 PM
Home
শাস্তিতত্ত্বের ক্রমবিকাশ
ফাহিম আহমেদ লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Tuesday, 25 April, 2017 at 4:56 PM, Count : 79
প্রাচীন ভারতের মনু ও কৌটিল্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিতকরণে অপরাধের শাস্তির ওপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। কৌটিল্য তার অর্থশাস্ত্রে বলেন, ‘অপরাধের জন্য রাজা প্রয়োজনের অধিক শাস্তির বিধান করলে জনগণ তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে পারে। আবার প্রয়োজনের কম শাস্তির বিধান রাজার প্রতি জনগণের অশ্রদ্ধা তৈরি করতে পারে। রাজা যদি আইনানুযায়ী অপরাধের নিরপেক্ষ শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে পারে তবেই তিনি জনগণের সম্মান লাভে সক্ষম হবেন।’ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে আইন ভঙ্গকারীদের দোষী সাব্যস্ত ও তা যাচাইয়ের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করা হয়। আধুনিক যুগে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অভ্যন্তরে শাস্তির যে বিধান প্রচলিত তা একদিনের ফসল নয়। বহু যুগের শাস্তির বিধান বিবর্তিত হয়ে আজকের অবস্থায় উন্নীত হয়েছে। বিভিন্ন যুগের শাস্তি তত্ত্বকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা—ক. প্রতিশোধমূলক, খ. প্রতিরোধমূলক, গ. সংশোধনমূলক শাস্তি। এ তিনটির সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে আধুনিক শাস্তি তত্ত্ব ও বিধান।

প্রতিশোধমূলক অপরাধের মূল ভিত্তি হলো রক্তের বদলে রক্ত। যদিও আধুনিক যুগে রাষ্ট্র মানুষের এ আকাঙ্খাটি রোধ করতে সচেষ্ট রয়েছে। আদিম যুগে এ তত্ত্বের আলোকে একজন ব্যক্তিকে হত্যা করা হলে সে হত্যাকারীকে খুঁজে বের করে হত্যার প্রতিশোধ নেওয়াই ছিল উক্ত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজনের মূল লক্ষ্য। আধুনিক রাষ্ট্রীয় আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও বর্তমানে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কয়েকটি গোষ্ঠীর মধ্যে এ প্রথাটি এখনো প্রচলিত রয়েছে। প্রতিরোধমূলক শাস্তি তত্ত্বের মূল কথা হলো অপরাধের শাস্তির মাধ্যমে তার পুনরাবৃত্তি না হওয়া নিশ্চিত করা। মধ্যযুগে এ তত্ত্বের ভিত্তিতে অপরাধীর শাস্তি হিসেবে তার হাত অথবা পা কর্তন কিংবা পঙ্গু করার বিধান ছিল। বর্তমান সময়ে সৌদি আরব ও চীনে ধর্ষণের শাস্তিস্বরূপ শিরচ্ছেদ ও খোজাকরণ এ শাস্তি তত্ত্বের উদাহরণ।

প্রতিরোধমূলক শাস্তি তত্ত্ব নিয়ে প্রচলিত একটি গল্পে বিচারক বলেন, ‘আমি তোমাকে ভেড়াটি চুরি করার জন্যে শাস্তি দিচ্ছি না। আমি তোমাকে শাস্তি দিচ্ছি যেন মানুষ ভবিষ্যতে ভেড়া চুরি না করে।’ সংশোধনমূলক শাস্তি তত্ত্বের সমর্থকেরা অপরাধকে একটি মানসিক রোগ হিসেবে মনে করেন। তারা অপরাধীর প্রতি সদয় আচরণ করার পক্ষপাতী যেন সে আরোগ্য লাভ করতে পারে। সঠিক চিকিত্সার দ্বারা রোগ মুক্তির মতোই অপরাধ প্রবণতা থেকে মানুষকে মুক্ত করা সম্ভব বলে তারা মনে করেন। এ তত্ত্ব অনুযায়ী একজন মানুষ ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নৈতিক শিক্ষার অভাব, দূষিত পরিবেশে বসবাস, খারাপ সঙ্গ অথবা মানসিক রোগের কারণে অপরাধ করে। নরডিক দেশগুলোতে (ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, সুইডেন) অপরাধকে এ তত্ত্বের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়। এ তিনটি শাস্তি তত্ত্ব স্বতন্ত্রভাবে বিশ্বের কিছু অঞ্চলে উপস্থিত থাকলেও আধুনিক শাস্তি তত্ত্ব এ তিনটির মিশ্রণেই গঠিত।

আধুনিক জন আদালতে প্রতিশোধমূলক তত্ত্বের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তির আর্থিক ক্ষতি সাধন করা হলে অপরাধীকে শাস্তি হিসেবে অর্থের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। কুখ্যাত ও পেশাজীবী অপরাধীদের ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক তত্ত্ব অনুসরণ করা হয় যাতে তারা সে শাস্তি দেখে ভীত হয়ে তা থেকে বিরত থাকে। সংশোধনমূলক তত্ত্বের মাধ্যমে কিশোর ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের অপরাধ প্রবণতা দূর করে সঠিক নৈতিক শিক্ষার দ্বারা তাদের স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করতে বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র কাজ করে। যে-কোনো ধরনের অপরাধের শাস্তির ক্ষেত্রে একজন অপরাধীর বয়স, ব্যক্তিগত তথ্য ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা অবশ্য বিবেচ্য। সামাজিক জীব হিসেবে প্রতিটি মানুষই একটি সুন্দর জীবনের আশাবাদী। শাস্তির মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব। আর তাই যে-কোনো ধরনের শাস্তির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ন্যায়, শান্তি, সামাজিক স্থিতি ও অপরাধীর নৈতিক পরিবর্তন।

লেখক : শিক্ষার্থী, মাস্টার্স, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]