Saturday, 5 December, 2020, 5:13 PM
Home
শেয়ারবাজারে নেতৃত্ব ও লাউ কেনা
প্রথম আলোতে লিখেছেন মুহম্মদ মোফাজ্জল
Published : Saturday, 22 April, 2017 at 5:18 PM, Count : 98
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিনারে জাপানের এক অধ্যাপক শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। সেই সেমিনারের খবর সংগ্রহ করতে যাওয়া কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে বসে ছিলাম দর্শকসারিতে। জাপানি অধ্যাপক তাঁর বক্তৃতার একপর্যায়ে বললেন, শেয়ারবাজারের নেতা কারা (হু আর দ্য লিডারস অব দ্য ক্যাপিটাল মার্কেট)? এ কথা বলে অধ্যাপক ঘুরে দাঁড়ালেন। অধ্যাপকের প্রশ্ন শুনে পাশে বসা সাংবাদিক আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। অধ্যাপক নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তরে বললেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোই শেয়ারবাজারের নেতা (লিস্টেড কোম্পানিজ আর দ্য লিডারস অব দ্য স্টক মার্কেট)। তিনি বোঝাতে চাইলেন, ভালো কোম্পানির পারফরম্যান্সের ওপর কীভাবে শেয়ারবাজারের পারফরম্যান্স নির্ভর করে, ভালো মৌল ভিত্তির কোম্পানি কীভাবে বাজারের গভীরতা বাড়ায়, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে কার কী ভূমিকা হওয়া উচিত, ইত্যাদি।
আমাদের শেয়ারবাজারে কখনো দুর্বল কোম্পানির নেতৃত্ব (উৎপাদনে নয়, শেয়ারের বাজারদরে) এমনই দুর্বার হয় যে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ঘণ্টা বাজিয়ে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করতে হয়। তারপরও যখন দুর্বল মৌল ভিত্তির শেয়ারের বাজারদরের দুর্বার গতি থামে না, তখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করে। ততক্ষণে হয়তো মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যের নায়কেরা শেয়ার ছেড়ে বেরিয়ে যায়।
ফান্ডামেন্টাল (মৌল ভিত্তির) শেয়ার কেনার প্রসঙ্গে বাজারের কেউ কেউ বলেন, ‘ফান্ডামেন্টাল শেয়ার কিনে লাভ কী? ফান্ডামেন্টাল কিনতে কিনতে তো মেন্টাল হয়ে গেলাম। কোনো লাভ হয়নি।’ এটি স্বল্পকালীন বিনিয়োগকারীর বক্তব্য। শোনা যায়, অনেক বিনিয়োগকারীর মধ্যে কোন শেয়ারের পেছনে কারা আছেন, সেটা জেনে বিনিয়োগ করার প্রবণতা আছে। তাঁদের কাছে শেয়ারের মৌল ভিত্তির চেয়ে পেছনের ব্যক্তিরা মুখ্য। কোন শেয়ারে কারা আছেন, সেটা হয়তো জানতে পারেন। তবে যাঁদের অনুসরণ করা হয়, তাঁরা কখন শেয়ার ছেড়ে বেরিয়ে যান, তখন কি অনুসারীরা জানতে পারেন? অধিকাংশ সময় অনুসরণকারীদের প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলত সেটাই হয়।
ধরা যাক, একজন বিনিয়োগকারী শেয়ার কিনলেন কোম্পানির ভালো মৌল ভিত্তি এবং কোম্পানি পরিচালনার সঙ্গে জড়িত লোকজনের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে। তাঁর বিশ্বাস কেবল কোম্পানির প্রবৃদ্ধির ওপর। এবং তাঁর মতো বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে লাগল। তাঁদের সবারই বিশ্বাস কোম্পানির প্রবৃদ্ধির ওপর। বাজারে কোম্পানির শেয়ারের পেছনে কারা আছেন, সেটা তাঁদের কাছে বিবেচ্য নয়। এমনটা হলে বাজার হতো ভালো মৌল ভিত্তিনির্ভর। এতে কোম্পানির প্রবৃদ্ধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের সুফল পেতেন। সর্বোপরি এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ত জাতীয় অর্থনীতিতে।
এখন ধরা যাক, ভালো মৌল ভিত্তিনির্ভর বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ল না এবং দুর্বল মৌল ভিত্তির শেয়ারের দৌরাত্ম্য বিরাজমান। এ অবস্থায় একজন ভালো মৌল ভিত্তির শেয়ারে বিনিয়োগ করে বসে আছেন। তিনি কি লোকসানে পড়বেন? ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের শেয়ারের মূল্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০৭ সালের ১ লাখ টাকার মূল্যমানের কিছু বহুজাতিক ও দেশীয় কোম্পানির শেয়ারের বাজারদর ২০১৬ সালে ২ লাখ ১৯ হাজার টাকা থেকে ৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। ২০১০-১১ সালে বাজারে ব্যাপক ধসের মাঝেও যাঁরা এসব শেয়ার ধরে রেখেছিলেন, তাঁরা কেউ লোকসান করেননি। নীরবে এসব কোম্পানি নেতৃত্ব দিয়ে গেছে। তাদের নেতৃত্বের ভিত্তি হচ্ছে ব্যালেন্সশিট। বাজারে দীর্ঘ মেয়াদে তারাই নেতৃত্বের আসনে থাকবে, যাদের আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা ও প্রবৃদ্ধি আছে। বাজারে বহুজাতিক কোম্পানি ছাড়াও দেশীয় অনেক কোম্পানির মৌল ভিত্তিক নেতৃত্ব আছে। তবে মোট তালিকাভুক্ত কোম্পানির তুলনায় সংখ্যাটা এখনো হয়তো আশানুরূপ নয়।
তালিকাভুক্ত কোম্পানি যদি হয় শেয়ারবাজারের নেতা, তবে সেই নেতা চিনতে হলে আর্থিক প্রতিবেদনে নেতার (কোম্পানি) আমলনামা বুঝতে পারার মতো জ্ঞান, কৌতূহল এবং সচেতনতা থাকতে হবে। ভালো মৌল ভিত্তির দেশীয় অনেক কোম্পানি আছে, যেগুলো এখনো শেয়ারবাজারে আসেনি। এসব কোম্পানির এখনো না আসার কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, তারা শেয়ারবাজারে আইনি কাঠামোয় বিনিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জবাবদিহিতে যেতে চায় না। কেউ কোম্পানিতে পারিবারিক প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখতে চায় বলে শেয়ারবাজারে যেতে আগ্রহী নয়। এটাও বলা হয় যে কোম্পানির সাধারণ সভায় সংঘবদ্ধ হয়ে কিছু লোক প্রভাব খাটায় বলে পরিচালকেরা স্ত্রী বা বোনকে সাধারণ সভায় বসাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন না। এসব কারণে তাঁরা সুদবিহীন শেয়ারবাজারের পুঁজির চেয়ে সুদযুক্ত ব্যাংকঋণের দ্বারস্থ হন। আবার এমন কোম্পানিও আছে, যারা শেয়ার ছাড়ার প্রয়োজনই মনে করে না। অথচ শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির যে ট্যাক্স বেনিফিট আছে, সেটা অতালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে নেই। ভালো মৌল ভিত্তির কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে নিয়ে আসার জন্য দৃশ্যমান উদ্যোগও তেমন দেখা যায়নি। বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে ভালো মৌল ভিত্তির শেয়ারের আধিক্য ও নেতৃত্ব বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
২০০৯-১০ সালে বাজারে যখন শেয়ারের চাহিদা ছিল, তখন সরকারি কোম্পানিগুলো শেয়ার ছাড়েনি। তখন সরকারি শেয়ার ছাড়লে ভালো মূল্য যেমন পাওয়া যেত, তেমনি নতুন শেয়ারের প্রবাহ বাজারে সমতা আনয়নে অনেকটা সহায়তা করত। সরকারি কোম্পানির শেয়ার ছাড়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর একটি নির্দেশনা আছে বলে আমরা জানি। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সরকারি কোম্পানিগুলোর বহু মিটিং ও বেঁধে দেওয়া সময়সীমা অতিক্রমের পরও শেয়ার ছাড়ার বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী সম্প্রতি ২৬ সরকারি কোম্পানি বাজারে শেয়ার ছাড়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন জটিলতার কথা বলেছে।
২০১০-১১ সালের শেয়ারবাজার ধসের পর সরকারের তিক্ত অভিজ্ঞতা কম হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে আর্থিক প্রণোদনা দিয়েছিল। তবে শেয়ারবাজার যতক্ষণ না তার নিজস্ব শক্তির ওপর দাঁড়ায়, ততক্ষণ তার স্থিতিশীলতা আসে না। বাজার এখন অনেকটা স্থিতিশীলতার পথে। তবে বিনিয়োগকারীদের মনে রাখতে হবে, অর্থ আমার, তাই লাভ-লসও আমার। ৫০ টাকার লাউ কিনতে যেভাবে চিমটি কাটা হয়, ৫০ লাখ টাকার শেয়ার কিনতে সেভাবে চিমটি কাটলেই বোধ হয় বিনিয়োগের অনেকটা সুরক্ষা হবে। তবে বাজারের নিয়ন্ত্রক ও সহায়ক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সময়োপযোগী না হলে আলোচনা-সমালোচনা থাকতেই পারে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা কিছু নতুন আইন প্রণয়নের পাশাপাশি অনেক পুরোনো আইন যুগোপযোগী করেছে।
মুহম্মদ মোফাজ্জল: সাংবাদিক।









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]