Thursday, 26 November, 2020, 12:00 PM
Home
হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলকে গুরুত্ব দিন
কালেরকন্ঠে লিখেছেন ড. নিয়াজ আহম্মেদ
Published : Saturday, 22 April, 2017 at 5:18 PM, Count : 81

প্রতিবছর জুন মাসে বাজেট পেশ করা হয় এবং যথারীতি পরবর্তী মাস থেকে তা কার্যকর হয়; কিন্তু হাওর ও পাহাড়ি মানুষের ভাগ্যের তেমন কোনো পরিবর্তন হয় না। হাওরের মানুষ ফসল রক্ষায় বাঁধ নির্মাণের দাবি জানাতে থাকলেও তা আর হয় না। আগাম বন্যায় ভেসে যায় তাদের সব ফসল। বাজেটে অনেকের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় সত্য, কেননা তা না হলে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামো এমন গতিশীলতার মুখ দেখত কিভাবে। কিন্তু বারবারই বাজেটে উপেক্ষিত হচ্ছে হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষ। অঞ্চলগত বহু বিষয়ে পার্থক্য, যা প্রাকৃতিক ও পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত ও নির্ভরশীল, তাদের অনেক কিছু অন্যদের চেয়ে আলাদা। এর বড় কারণ তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও আলাদা ভাষা। তাদের মূল ও শিকড়কে বিবেচনায় না এনে গত্বাঁধা পথে প্রকল্প গ্রহণ করলে ভালো ফল দেয় না এবং উন্নয়নের মূল ধারায় আনাও সম্ভব হয় না।

বাজেট প্রণয়নে বহুদিন ধরে আঞ্চলিক বাজেট এবং স্থানীয় মানুষের চাহিদা ও প্রয়োজনকে মূল্যায়ন করার বিষয়টি আলোচিত হয়ে আসছে। এ কথা সত্য যে বাংলাদেশের সব অঞ্চলের মানুষের চাহিদা ও প্রয়োজন সমান নয়। সব অঞ্চলে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যাও সমান নয়। পাহাড়ি ও হাওর অঞ্চলের পরিমাণও মোট ভূখণ্ডের তুলনায় বেশি নয়। গত কয়েক বছরে আমরা বড় কোনো বন্যার কবলে পতিত হইনি। আমাদের সব অঞ্চলের মানুষও ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে না। নদীভাঙন এক গতানুগতিক বিষয় হলেও এর দ্বারা বিপর্যস্ত মানুষের সংখ্যাও বেশি নয়। কিন্তু বড় বিপর্যয় দেখা দেয় হাওর অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা। প্রকৃতির কাছে আমরা অসহায় সত্য; কিন্তু প্রকৃতিকে মোকাবেলা করার জন্য আমাদের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। ফলে নিঃস্ব হচ্ছে হাজার হাজার পরিবার, যাদের এক ফসলের ওপর সারা বছরের জীবনধারণ নির্ভরশীল। এমন পরিস্থিতি তাদের জন্য একেবারে নতুন নয়। দুর্ভাগ্য, এই জায়গায় আমাদের স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তাদের ফসল রক্ষা করা যাচ্ছে না, তেমনি তাদের ভরণ-পোষণের জন্য কোনো বিশেষ বরাদ্দও চোখে পড়ছে না।

হাওর অঞ্চলের মানুষের শুধু জীবিকাই নয়, তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের দিকটিও চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বছরের নির্দিষ্ট সময় ভূমি পানিতে ডুবে থাকায় তাদের দুর্ভোগের শেষ থাকে না। এর ফল শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া এবং শিশু ও প্রসূতিঝুঁকির মধ্যে থাকা। শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার কারণে তারা মূলস্রোতধারায় কম আসতে পারছে। এ জন্য প্রয়োজন এই অঞ্চলের মানুষের জন্য বিশেষ প্রকল্পভিত্তিক বাজেট প্রণয়ন। এ পর্যন্ত বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কাজ করলেও তাদের কার্যক্রম ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। আমাদের পাহাড়ি অঞ্চলের বৈচিত্র্য অনেকের জানা। আমরা পার্বত্য অঞ্চলের দিকে তাকালে দেখি তাদের নিজস্ব কিছু উৎপাদন পদ্ধতি রয়েছে, বাকি সব কিছু সাধারণ উৎপাদনব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ভৌগোলিক অবস্থানজনিত ও তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষা আলাদা হওয়ায় নিজস্বতা ধরে রাখার কারণে তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। পাহাড়ি মানুষ নিজেদের ভাষায় রচিত বই যেমন পড়ছে, পাশাপাশি যে ভাষায় আমরা পড়ছি তা-ও পড়ছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করে অনেকে উচ্চশিক্ষাও গ্রহণ করছে। ফলে চাকরির জায়গায়ও তারা এগিয়ে চলছে। কিন্তু যাদের সুযোগ আগে হয়নি কিংবা সুযোগ গ্রহণ করতে পারছে না তাদের জন্য কী করার আছে। তাদের নিজস্বতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ তৈরি করে দেওয়া উচিত। তারা হয়তো শতভাগ মূলস্রোতধারায় আসতে পারবে না এবং এমনটি আশা করাও ঠিক নয়। কিন্তু তাদের জায়গায় রেখেই তাদের সহায়তা করা যেতে পারে।

চা বাগান অঞ্চলের বাসিন্দারা কতটা মানবেতর জীবন যাপন করে, তা না দেখে বিশ্বাস করা যায় না। নামমাত্র মজুরিতে শ্রমবিনিময়, কাজের নিশ্চয়তা না থাকা তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। এমন জায়গায় সরকারের আশু হস্তক্ষেপ জরুরি। প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে মালিকপক্ষকে বাধ্য করা, যেন তারা বেতন কাঠামোর মধ্যে পরিবর্তন এনে তাদের ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণের পথ তৈরি করে। যদি সম্ভব না হয়, তাহলে তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। কোনো অংশ কিংবা শতাংশের বিবেচনায় নয়, সব চা শ্রমিককে এর আওতায় আনতে হবে। পাহাড়ি মানুষের মতো তাদেরও নিজস্বতা রয়েছে, যা বিবেচনায় এনে চা শিল্পের বিকাশের পথ সহজ করা প্রয়োজন।

বাজেট আসে, বাজেট যায়, বাজেটের আকার বাড়ে, অনেকের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়; কিন্তু হাওর ও পাহাড়ি মানুষের কোনো পরিবর্তন হয় না। আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় আঞ্চলিক উন্নয়নের কথা রয়েছে; কিন্তু কতটুকু এই অঞ্চলের মানুষের কথা বলা হয়। আমাদের অগ্রযাত্রায় নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশের কথা রয়েছে; কিন্তু তাদের জন্য কী রয়েছে? আমাদের যাত্রায় মধ্যম আয়ের কথা বলা আছে; কিন্তু হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলের জীবনমান উন্নয়ন ছাড়া তা কিভাবে সম্ভব? এখন বাজেট নিয়ে প্রতিনিয়ত আলোচনা চলছে। এর আওতা, পরিধি, ক্ষেত্র ইত্যাদির কথা বলা হচ্ছে, তবে বিশেষ অঞ্চলের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দের কথা মাথায় রেখে সমন্বিত ও টেকসই উন্নয়ন বাজেট প্রণয়ন করা জরুরি। বর্তমান আর্থিক বছর শেষের পথে। আগামী অর্থবছরে আকস্মিক বন্যায় সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্তদের কথা মাথায় রেখে বাজেট প্রণয়নের দাবি করছি।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]