Tuesday, 4 August, 2020, 2:39 PM
Home
হাওড়ে উন্নয়ন ও আবেগের দ্বন্দ্ব
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
Published : Wednesday, 12 April, 2017 at 8:44 PM, Count : 51

বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ সাবেক বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও সিলেট জেলার বিশাল এলাকা নিয়ে হাওরাঞ্চল গঠিত। সম্প্রতি হাওরাঞ্চলে ভ্রমণের সময় ও হাওর নিয়ে কাজ করা সংগঠনের কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় 'উন্নয়নের আবেগ' অর্থাৎ যে কোনো মূল্যে সমতলের মতো মাটির সড়ক ব্যবস্থা এবং এর সঙ্গে পরিবেশ-প্রতিবেশের দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিয়ে আমার প্রত্যক্ষ ও বিশ্লেষণমূলক মতামত।

বর্তমানে হাওরাঞ্চলে সমতলের মতো করে সড়ক যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যে সড়ক বাঁধের মতো পানি আটকাবে এবং পরিবেশ-প্রতিবেশকে ধ্বংস করবে। উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ-প্রতিবেশের দ্বন্দ্ব অতি প্রাচীন। এ বিষয়ে আমি আমার এক প্রফেসরের মতামত আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাই। আমি যখন বেলজিয়ামের গেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করছিলাম সে সময় প্রফেসর ড. ভ্যান ডেন হিদি (বেলজিয়ামে আমার লোকাল গার্জেন ছিলেন) এক আলাপচারিতায় বলেছিলেন, বোকাদের উন্নয়ন হয় কোনো কিছুকে ক্ষতি করে। বিশেষ করে যদি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনগণ ও প্রশাসন মূর্খের স্বর্গে বাস করে তাহলে তারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশকে ধ্বংস করে নতুন উন্নয়ন করে বা করতে চায়। এতে করে ধ্বংস করা অংশের উন্নয়নের নামে আবার প্রকল্প আসবে, লাভবান হবে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনের কর্তব্যক্তিরা। অনেকটা ভিসিয়াস সার্কেলের মতো। আর বোকা জনগণ উন্নয়নের নামে আতশবাতির মতো ক্ষণিক ঝলকানি দেখে বিবেক-বোধশূন্য হয়ে কয়েকদিনের কায়িক শ্রম বিক্রি করে খুশিতে আত্মহারা হবে। তিনি আরও বলেছিলেন, মূর্খ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের টার্গেট থাকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থান, বিশেষ করে বনভূমি, জলাশয়, নদী, ঐতিহাসিক স্থান ইত্যাদির ওপর। তারা জনগণকে বোঝায় কোনো কিছু পেতে গেলে কিছু হারাতে হয়। তারা জনগণের আবেগের সঙ্গে উন্নয়নের সম্পর্ক জুড়ে দিয়ে ফায়দা লুটে বা লুটতে চায়। কিন্তু ক্ষতি না করেও যে উন্নয়ন করা যায় তা জনগণ জানে না বা জানানো হয় না। সে ক্ষেত্রে পরিবেশবিদ, পরিবেশ কর্মী এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মীবৃন্দ বিশেষ ভূমিকা নিয়ে জনগণকে সচেতন করে ক্ষতিহীন উন্নয়ন করার আন্দোলন করতে পারেন। বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়ন পরিস্থিতির সঙ্গে প্রফেসর ড. ভ্যান ডেন হিদির মতামতের ব্যাপক মিল রয়েছে। হাজারো বছর ধরে বিদ্যমান সুন্দরবন ধ্বংসকারী রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প যেমন গ্রহণ করা হয়েছে, তেমনি সৃষ্টির আদি থেকে বিরাজমান হাওরের পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংসকারী বাঁধের মতো মাটির রাস্তা তৈরি হচ্ছে।

হাওরাঞ্চলের যোগাযোগ, বিশেষ করে সড়ক যোগাযোগের ব্যবস্থা দেশের অন্য অঞ্চলের মতো নয়। সে রকমটি হওয়াও পরিবেশ-প্রতিবেশসম্মত নয়। কারণ ছয় মাস পানির নিচে থাকায় এবং পরিবেশগত বিশেষ অঞ্চলের অন্তর্গত হওয়ায় কোনো সরকার বা প্রশাসন অতীতে সমতলের মতো মাটির রাস্তা তৈরি করে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে চেষ্টা করেনি। সম্ভবত ওইসব প্রশাসনের কাছে হাওরের পরিবেশ-প্রতিবেশ বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ায় তারা সড়ক উন্নয়নের নামে পরিবেশ-প্রতিবেশ বিপন্নকারী বাঁধ তৈরি করতে চায়নি। বর্তমানে হাওরাঞ্চলের উন্নয়ন, বিশেষ করে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সর্বত্র আলোচনার বিষয়; কারণ অনেকগুলো সড়কবাঁধ নির্মাণের প্রকল্প গৃহীত হয়েছে। এই উন্নয়ন প্রকল্প যেমন এ অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে আবেগের সৃষ্টি করেছে, তেমনি বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে হাওরের পরিবেশ ও প্রতিবেশ।

উদাহরণস্বরূপ নির্মীয়মাণ ইটনা থেকে মিঠামইন হয়ে অষ্টগ্রাম পর্যন্ত ২৯.১৫ কিলোমিটার সড়কবাঁধকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। এ অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে এই সড়কবাঁধ বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে। বিশাল আবেগেরও সৃষ্টি করেছে। কারণ তারা সমতলের সমান হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এ এলাকার এক রাজনীতিবিদের প্রচার স্ট্যান্ট 'বাসে চড়ে ঢাকা যাওয়ার' ওয়াদাও পূরণ হতে চলেছে। অথচ এই সড়কবাঁধ তাদের অঞ্চলের পরিবেশ-প্রতিবেশে কী বিরূপ প্রভাব ফেলবে, জীবন-জীবিকাকে কীভাবে বিপন্ন করবে, সে বিষয়ে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। এসব কথা বললেই উন্নয়নের বিরোধিতাকারী হিসেবে দোষারোপ করে ক্ষিপ্ত হচ্ছেন। উন্নয়ন আবেগটাই তাদেরকে বিবেকশূন্য করছে। এখন দেখা যাক এই সড়কবাঁধ কীভাবে পরিবেশ-প্রতিবেশ এবং জীবন-জীবিকার ক্ষতিসাধন করবে।

এই সড়কবাঁধ তৈরির জন্য ৯১.৫২ হেক্টর জমি অ্যাকোয়ার করা হয়েছে অর্থাৎ ৬৭৮.১৬ বিঘা জমি ধান চাষসহ বিভিন্ন কৃষিকাজের জন্য চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। এই জমির ওপর দিয়ে রাস্তা হবে এবং বাকি জমির মাটি কেটে রাস্তায় ব্যবহার করা হবে। ফলে রাস্তার দু'পাশে স্থায়ী গভীর গর্ত বা নয়নঝুলির সৃষ্টি হবে। সাধারণ অবস্থায় ডাঙ্গার অংশ বাদে ২৯ কিলোমিটার সড়কবাঁধের জায়গার মধ্য দিয়ে হাওরের পানি এপাশ থেকে ওপাশে অবাধে প্রবাহিত হতো। প্রতিবছর ছয় মাস পানি প্রবাহিত হয়ে ছয় মাসের জন্য মোটামুটি শুকিয়ে এ অঞ্চলের জমি ধান চাষ ও কৃষিকাজের উপযোগী হতো। এ সড়কবাঁধ পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে কৃষিকে ব্যাহত করবে বা পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে। কারণ ২৯ কিলোমিটারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হাওরের পানিকে মাত্র ৭৮৮.৮৪ মিটার (মোট ৪৪ মিটার দৈর্ঘ্যের ৭টি বক্স কালভার্ট, ১৫৪.৩৫ মিটার দৈর্ঘ্যের ৭টি আরসিসি সেতু এবং ৫৯০.৪৯ মিটার দৈর্ঘ্যের ৩টি পিসি গার্ডার সেতু :সূত্র-সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়) জায়গার সেতু ও কালভার্ট দিয়ে প্রবাহিত করতে বাধ্য করা হবে। একটু ঐকিক নিয়ম ব্যবহার করে দেখা যাক সমপরিমাণ পানি ৭৮৮.৮৫ মিটার জায়গার সেতু ও কালভার্ট দিয়ে প্রবাহিত হতে কত সময় লাগবে। ২৯ কিলোমিটার বা ২৯০০০ মিটার জায়গার মধ্য দিয়ে পানি প্রবাহিত হতে সময় লাগত গড়ে ৬ মাস, তাহলে ৭৮৮.৮৪ মিটার জায়গার মধ্য দিয়ে যেতে ওই একই পরিমাণ পানির সময় লাগবে ২২০.৫৮ মাস অর্থাৎ ১৮.৩৮ বছর। হিসাবটি সরলীকরণ হয়ে গেল বলে অনেকে দুষবেন; কিন্তু ওই এলাকার পানি প্রবাহিত হতে ছয় মাসের বেশি সময় লাগা মানেই কৃষি ব্যাহত হওয়া। প্রতি বছর সব পানি বের হতে না পেরে কিউমুলেটিভ হারে পানি ও পলি জমা হতে থাকবে এবং বিরাট আবদ্ধ জলাশয়ের সৃষ্টি হবে। সড়কবাঁধের উজানেও পানির উচ্চতা বাড়বে, ফি বছর বন্যা হবে এবং কৃষি ব্যাহত-বন্ধ হবে। কৃষিকাজের উপযোগী শুকনো জমি পাওয়া যাবে না এবং কৃষি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। মাছের উৎপাদন ও সংগ্রহ করা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে যাবে। মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর আঘাত আসবে। বেশিসংখ্যক মানুষ জীবিকার জন্য শহরমুখী হবে।

এই সড়কবাঁধ মৎস্যসম্পদের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলবে। বিভিন্ন মাছের বিচরণ ক্ষেত্র বিনষ্ট হবে, প্রজনন এলাকা বিনষ্ট হয়ে উৎপাদন কমে যাবে বা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হবে। তাছাড়া এই সড়কবাঁধ যে আবদ্ধ জলাশয় সৃষ্টি করবে তাতে অনেক মাছ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অভিযোজন করতে না পেরে চিরতরে হারিয়ে যাবে। ফলে স্বাদুপানির এই মৎস্য উৎসটি মারাত্মকভাবে অজন্মা হবে বা উৎপাদন বন্ধ হয়ে মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত করবে। পরিণামে তীব্র বেকারত্বের সৃষ্টি হবে। শ্রমিক শ্রেণির মানুষ পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে।

এই সড়কবাঁধ অন্য যোগাযোগ ব্যবস্থারও মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করবে। ভরা হাওরে নৌচলাচল করতে হলে তিনটি গার্ডার সেতু দিয়ে যেতে হবে। ফলে ঘুরপথে সময় ও খরচ বেশি লাগবে। এই সড়কবাঁধের দু'পাশের কৃষক, কৃষি ফসল, গবাদিপশু, কৃষি যন্ত্রপাতি_ টিলার, থ্রেসার ইত্যাদি চলাচলে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে। ৭ মিটার বা ২১ ফুট উঁচু সড়কবাঁধ ডিঙিয়ে এসব চলাচল করানো শ্রম ও সময়সাধ্য হবে। কৃষকদের কাজ করার সময় (দৈনিক কর্মঘণ্টা) কমে যাবে; ফলে ফসল উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। তাছাড়া দীর্ঘদিন এসব চলাচলে জিওটেক্সটাইল ব্লক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রাস্তার স্থায়িত্ব হুমকিতে ফেলবে।

প্রকৃতি সমসময় তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া বাধার প্রতিশোধ নেয়। প্রতিশোধ মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপরই শুধু নয়, কোনো এক অতিবৃষ্টির সময় হাওরের পানি বেড়ে গিয়ে এমন বানের সৃষ্টি করবে, যা সোকল্ড জিওটেক্সটাইল ও নরম পলি-কাদার তৈরি সড়কবাঁধ ভাসিয়ে নিয়ে সমান করে দেবে। সেদিন শুধু হাওরবাসী নয়, ভাটির সব অঞ্চলই মহাবানের কবলে পড়বে। পরিণামে জানমালের প্রভূত ক্ষতিসাধিত হয়ে মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে। তবে এখনই আমাদের এ প্রজন্ম সেটি হয়তো দেখবে না, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এটি ঘটতে দেখতে পারবে।

তাই সমতলের মতো মাটির তৈরি বাঁধ বা রাস্তা নয়, তৈরি করুন হাওরের কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশ-প্রতিবেশ উপযোগী যোগাযোগ ব্যবস্থা। আধুনিক নৌচলাচল ব্যবস্থা হতে পারে এ অঞ্চলের প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থা । তাছাড়া ফ্লাইওভারের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সড়কবাঁধ তৈরি ও মেরামত খরচ, ব্যয়বহুল জিওটেক্সটাইলের খরচ, অধিকৃত জমির খরচ, পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতির মূল্যমান, কৃষি ও মৎস্যসম্পদের ক্ষতির মূল্য, সড়কবাঁধের স্থায়িত্ব ও ঝুঁকি হিসাব করলে সড়কবাঁধের চেয়ে ফ্লাইওভার করা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে। পরিবেশ-প্রতিবেশের সঙ্গে দ্বন্দ্ব হবে না, অক্ষত থাকবে হাজারো বছর ধরে বিরাজমান হাওরের বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত পরিবেশ-প্রতিবেশ। সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক_ হাওরের পরিবেশ-প্রতিবেশ সংরক্ষিত থাকুক।

লেখকঃ অধ্যাপক, কৃষি ও পরিবেশ প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহ









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]